বাবা হওয়া কি মুখের কথা?

ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার পরিচয় কবে থেকে তা আমার সঙ্গত কারণেই মনে নেই| তবে বন্ধুত্বের শুরু সেই তখন থেকে যখন পানাগড়ে থাকতে ভোর পাঁচটায় উঠে তিনি রোজ পাড়ার চায়ের দোকানে প্রাতঃকালীন প্রথম চা-পান করতে যেতেন আর আমাকে সাথে নিয়ে যেতেন| আমি যেতাম তেনার কোলে চেপে, তাঁর শার্টের দ্বিতীয় বোতামটা মুখে পুরে চিবোতে চিবোতে| সেই শুরু, তারপর থেকে আজ অব্দি জীবনের সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী প্রথমে এনাকে না শোনাতে পারলে বিরিয়ানিও হজম হতে চায়না আমার| আরেকটু বড় হতে একরকম হাতে ধরে বাংলা পড়তে শিখিয়েছেন ইনি আমাদের|স্কুলে বাংলার পাট ছিল না| ছুটির দুপুরে ভরপেট মাংস-ভাতের পর ভাতঘুমের লোভে আমরা গিয়ে উঠতাম বিছানায়| এক বালিশে ঠাসাঠাসি করে দুপাশে আমি আর বোন, মধ্যিখানে উনি| এরপর সুকুমার সমগ্র থেকে একের পর এক ছড়া আবৃত্তি করে যেতেন|বোম্বাগড়ের রাজা, ট্যাঁশগরু, হুঁকোমুখো হ্যাংলা, শব্দকল্পদ্রুম| পড়তে না পারলেও ছবিগুলো দেখতাম অবাক হয়ে| শুনতে শুনতে দুচোখের পাতা ভারী হয়ে আসতো আর কখন যেন পৌঁছে যেতাম এক অলীক অনন্য জগতে| দুইখানা ল্যাজ দুলিয়ে অদ্ভুত কান ওয়ালা এক প্রাণী যেখানে মাছি তাড়াতে হিমশিম খাচ্ছে, কিম্বা হারুদের অফিসে খুব স্টাইল করা ঢুলুঢুলু চোখ একজন কিম্ভুত কায়দায় বসে আছে| তারপর শিবরাম, পাগলা দাশু, ঠাকুরমার ঝুলি| ‘বিদ্রোহী’র এমন দুর্দান্ত আবৃত্তি আর কেউ করতে পারে বলে আমার জানা নেই| বাংলা পড়তে শিখে গেলাম আর শেয়ালকে ভাঙা বেড়া দেখালে যা হয়, তাই হল| আমরণের বন্ধুকে খুঁজে পেয়ে গেলাম – বই|

আমার জীবনের একমাত্র সুপারহিরো হলেন ইনি| ছোটখাটো সাধারণ জিনিসের ওপর খানিকক্ষণের মধ্যে অসামান্য কারিগরি ফলিয়ে তার ভোল পাল্টে ফেলেন| স্কুলে যখন নার্সারিতে পড়ি, যাকে এখন বলে প্রি-স্কুল, তখন একবার দিদিমণি বলে দিলেন বাড়ী থেকে একটা ডিমের খোলা নিয়ে আসতে হবে, পুতুলের মুণ্ডু বানানো হবে| আমি গিয়ে বল্লাম বাড়ীতে|ইনি করলেন কি একটা ডিমের বিপরীত দুই দিকে ছুঁচ দিয়ে দুটো ফুটো করলেন| তারপর একটার ভেতর ফুঁ দিয়ে দিয়ে অন্যটা দিয়ে ডিমের ভেতরের মালকড়ি সব বের করে ফেললেন| তারপর একই কায়দায় জল দিয়ে ডিমের ভেতরটা ধুয়ে ফেলা হল| শেষে যা দাঁড়ালো তা হল একটা পুরো আস্ত ডিমের ফাঁকা খোল ! তা নিয়ে উত্তেজনায় ফুটতে ফুটতে  স্কুলে গেলাম আমি| দিদিমণিরা একে অন্যকে ডেকে ডেকে দেখালেন সেই জিনিস| দুঃখের বিষয় স্কুলগুলোতে এখনকার মতন তখনও নবীন চিন্তাভাবনার জায়গা ছিলোনা| গতে বাঁধার বাইরে গেলেই ঠুকে-পিটে আবার ছাঁচে ফেলা হতো| তাই ডিম নিয়ে খানিক ‘ওমা’ ‘আরি শাবাশ’ করার পরে দিদিমণি ডিমের একদিকে যথাবিধি খুঁচিয়ে ধ্যাবড়া খোঁদল করলেন ও সেখানে কাঠি গুঁজে পুতুলের মুণ্ডু ও ধড় বানিয়ে ফেললেন| খুবই হতাশ হয়েছিলাম|

আমি অতি বদ বাচ্চা ছিলাম বলে মায়ের সঙ্গে খিটিমিটি লেগেই থাকত| এইসব সময়ের  উদ্ধারকর্তা ছিলেন ইনি| একবার কেন যেন মা’র সাথে রাগারাগি করেছি,দুপুরে অনশন ধর্মঘট করেছি| সকলে বলে বলে ক্লান্ত| মাও দূরছাই বলে বোনকে খাইয়ে নিজে খেয়ে-দেয়ে গল্পের বই হাতে প্রস্থান করেছে| আমি বসে আছি জানলার ধারে, ঠা ঠা পিচগলা দুপুরে বাইরে কেউ কোথাও নেই| থমথম করছে যেন চারদিক, গাছের পাতাগুলো অব্দি গম্ভীর ভাবে চুপ| এমন সময়ে একটা কাক কর্কশ ‘কা কা কা’ আওয়াজ করে উড়ে গেলো| বাবা অমনি এসে বলল, ‘ওই দ্যাখ, কাকটা অব্দি তোকে বলছে খা, খা খা’|ব্যাস, কেমন ফিক করে হাসি পেয়ে গেলো| ‘আরেকবার সাধিলেই খাইব’ কে সত্যি প্রমাণ করে গুটিগুটি টেবিলে গিয়ে বসলাম| মা ঘর থেকে খ্যাচখ্যাচ করে বলল, ওর জন্যে আলাদা করে মিষ্টি দই তোলা আছে, বলে দাও|

যেকোনো সুপারহিরোর মতই এনার অসীম সহ্যশক্তি|

একদিন বিকেলে মা আমার হাতে চায়ের কাপ-প্লেট ধরিয়ে বলল বাবাকে দিয়ে আসতে| আমি আবার যেকোনো কাজের গুরুদায়িত্ব পেলে অত্যুৎসাহে অনেক সময় সেটা মাটি করে ফেলি| তাই চায়ের কাপ হাতে সারসের কায়দায় সন্তর্পণে যাচ্ছিলাম| প্রায় পৌঁছেও গেছিলাম| এদিকে, গরমকাল ছিল বলে ইনি মেঝেতে খালি গায়ে আধশোয়া হয়ে ছিলেন| আমি প্লেটটা নামানোর সময়ে কি করে চা একটু চলকে গেলো আর তাই সামাল দিতে গিয়ে প্লেটটা হাত ফসকে হঠাৎ পড়ে গেলো| ব্যাস, আগুন গরম চা সমস্তটাই পড়লো গিয়ে খোলা গায়ের ওপর| মা তো রান্নাঘর থেকে হাঁউমাঁউ করে তেড়ে এলো| আজ এই সিন থেকে বেঁচে কিছুতেই বেরোতে পারব না অনুমান করে, আমি ভয়ে শিঁটিয়ে দাঁড়িয়ে আছি| মা উত্তম মধ্যম শুরু করা আগেই হাঁ হাঁ করে থামিয়ে উনি হাসিমুখে বললেন, আরে কিচ্ছু হয়নি আমার| একটু জল দিলেই হবে| তুই যা তো ন্যাতা নিয়ে আয় বলে অকুস্থল থেকে আমাকে সরিয়ে দিয়ে নিজে গেলেন জল দিতে| এমন সুবর্ণ সুযোগ আর শিকার হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় মা উপায়ান্তর না দেখে গজগজ করতে করতে পুনরায় রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকল|

এটা ওনার সহ্যশক্তির খুব সামান্য উদাহরণ| অসাধারণ শারীরিক যন্ত্রণা টুঁ শব্দ না করে একেবারে মুখ বুজে সইতে দেখেছি বহুবার|

আক্ষরিক অর্থেই জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সব করে থাকেন| বেশীরভাগ বাবাদের যেমন থাকে, এনারও একটা ‘টুল বক্স’ আছে| তাঁর মধ্যে থেকে অত্যাশ্চর্য সব হাতিয়ার বেরিয়ে তাক লাগানো সব মেরামতি সেরে আবার বক্সে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ে| আমাদের স্কুলের চামড়ার কালো ব্যালেরিনা জুতো ছিঁড়ে গেলে গুনছুঁচ দিয়ে ঠিক মুচিদের মতন করে ফোঁড় তুলে মেরামত করেছেন অনেকবার| পেঁপের ডাঁটির মধ্যে গলানো মোম ভরে নতুন মোমবাতি তৈরি করে দিতেন| আসামের তুমুল শিলাবৃষ্টির পর বাইরে বেরিয়ে একটা গেলাসের ভেতর সুতলি ধরে রেখে মারবেল সাইজের সেইসব শিলা দিয়ে ঠেসে ভরে সুতলি টেনে বের করলেই শিলার গেলাস তৈরি, একবার বানাতেই পাড়ার সব বাচ্চা পালে পালে বাড়ী থেকে গেলাস নিয়ে আসতে লাগলো, শিলাগুলো যতক্ষণ না গলে যায়, এই খেলা চলল তাঁকে ঘিরে| নিজেই ঘুড়ি বানিয়ে প্যাঁচ খেলা, পেয়ারা গাছের ডালে দোলনা বেঁধে দেওয়া, মায় বাড়ীতে জ্যান্ত মুরগী এলে পেছনের বারান্দায় নিজে হাতে কেটে পরিষ্কার করে তারপর রান্না, সবেতেই পারদর্শী| শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা নির্বিশেষে ভোর চারটেয় উঠে পড়েন| অনেকদিন অব্দি ভোরের কাঁচা ঘুম ভেঙে তাঁর উদাত্ত গলার চণ্ডীপাঠ শুনতে শুনতে আবার ঘুমিয়ে পড়েছি|

আমার সংসারে একমাত্র অতিথি যে দুধের খালি ক্যান, জ্যামের শিশি, বিস্কুটের কৌটো সব ধুয়ে মুছে জমিয়ে রাখে পরে কাজে লাগতে পারে ভেবে, ছেঁড়া গার্ডার গিঁট দিয়ে আবার ব্যাবহার করে, আমার জন্মেরও আগেকার এঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং বাক্সর সব টুলস যত্ন করে এখনো ব্যবহারোপযোগী করে রাখে| বাগানে কাঠবিড়ালি গর্ত খুঁড়ে তছনছ করছে, কোনও ওষুধেই কাজ হচ্ছেনা, শুধু ফোনে এই গল্প শুনে গর্তগুলোর মধ্যে গোলাপ গাছ কাঁটা শুদ্ধু ভরে রাখার নিদান দিয়ে কাঠবিড়ালিকে চিরতরে অর্ধচন্দ্র দিতে পারে যে, সে আর কেউ না, আমার বাবা|

জীবনের সবখানে হেরে এলেও জানি এনার কাছে আমিই সেরা|

আজ তোমার দিন, বাকী সব দিনগুলো হয়তো আমাদের কারণ জানি তুমি আছো, তাই|

Advertisements

একদিন প্রতিদিন

কুহু-কুহু কুহু-কুহু … কুহু-কুহু কুহু-কুহু
আহা, এইতো বসন্ত এসে গেছে| হাল্কা মিষ্টি ঠাণ্ডা, লেপটা গায়ে জড়িয়ে আরও একটু ঘুমনোর চেষ্টা চালাই|
কুহু-কুহু কুহু-কুহু … কুহু-কুহু কুহু-কুহু ঊ ঊ ঊ ঊ …
আরে কি জ্বালা, সবে প্লাস্টিক চাটনি পড়েছে পাতে, সাবড়ে এনেছি প্রায়| এখনও দই, রসগোল্লা বাকী, কোকিলটা এমন করে কেন !
এরপর বিকট কুহুঊঊঊঊঊর ধাক্কায় ধরাধামে ধড়াম করে পড়তে বাধ্য হই| অ্যালার্ম বাজছে !! বাইরে অন্ধকার, সকাল ছ’টা বাইশ বাজে !! দূরছাই, এইতো পাঁচ মিনিট হল ঘুমিয়েছি, এর মধ্যেই সকাল? মর্‌গে যা, আজ আর উঠবোই না| যাক সব রসাতলে| লাইফ হেল হয়ে গেলো দেখছি| কাউকে দাসখত দিয়ে রেখেছি নাকি, উঠবোই না আজকে, দেখি কি হয়|
পাঁচ মিনিট আরও ঘুমিয়েছি কি ঘুমাইনি প্রথমে বাথরুমে কলকল করে জলের আওয়াজ, তারপর পিঁ পিঁ পিক করে দরজার অ্যালার্ম বন্ধ করা হল, তারপরে শুরু হল রান্নাঘরে খুটখাট, ছড়ছড় করে কল খোলার আওয়াজ, কাপ-সসপ্যানের যুগলবাদ্য… এইসব কাঠের বাড়ী কেন যে বানায়| এদিকে বাইরের কোনও আওয়াজ ঢুকবে না, সারাক্ষণ মনে হবে যেন একটা বাব্লের মধ্যে বাস করছি| অখণ্ড নিস্তব্ধতা দিনমান| অথচ বাড়ীর মধ্যে সামান্যতম আওয়াজও এমন অ্যামপ্লিফাই হয়ে কানে লাগে যে চমকে চমকে উঠতে হয়|
আর মটকা মেরে থাকা চলেনা| চোখ ডলতে ডলতে পা ঘষটে বাথরুমে হাজির হই| দিন শুরু হয়ে গেলো|
সেখান থেকে বেরিয়ে প্রথম কাজ খুদে কুম্ভকর্ণকে টেনে তোলা| প্রতিদিন কিছু না কিছু কায়দাকানুন করতে হয়| যেমন আরে ওঠ ওঠ, স্কুল যাবি না? আজকে সেই টেডি বেয়ার পিকনিক আছে যে রে? (স্কুলগুলো পড়াশোনায় অষ্টরম্ভা হলে হবে কি, দেখনবাহার কীর্তিকলাপ খুব, ভাগ্যিস) বলতেই কাজ হয়, তড়াক করে উঠে পড়ে|
এসব কিছু না থাকলে অবশ্য ব্যাপারটা শেষে প্রায় শিশু নির্যাতন পর্যায়ে চলে যায়| আমি টেনে তুলে বসিয়ে দিই, সে আবার চালের বস্তার মতন আস্তে করে হেলে বিছানায় বডি ফেলে দেয়| ‘ওঠ রে, ওঠ রে’ করতে করতে ততক্ষণে আমার মেজাজের দফারফা, সকাল সক্কালই মাথা দপদপ করতে থাকে| মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় দিই কানের গোড়ায় এক, তেনার ঘুমও কাটবে, আমার মেজাজও ঠাণ্ডা হবে|
যাই হোক, শেষকালে মাতৃগঞ্জনাতে আর তিষ্ঠোতে না পেরে মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে জয় করে তিনি উঠে বসতে সক্ষম হন| সাতটা বেজে গেছে| এরপর তাকে ঠেলতে ঠেলতে বাথরুমে, সেখান থেকে একরকম কোলে তুলে কিচেনে, কারণ তখনও তিনি যেন ঘোরের মধ্যে স্বপ্নজাগরণে বিচরণ করছেন বলে মনে হয়|
এরপর ঝটিকা গতিতে সব হতে থাকে| একঢোঁক জল গিলে, প্রথমে ছেলের প্রাতঃরাশ তৈরি করে প্লেটে দিয়ে, এক কাপ দুধ গরম করে তাকে খেতে বসার ফার্স্ট ওয়ার্নিং দেওয়া হয়| দিয়েই তার লাঞ্চ বানাতে বানাতে তার স্ন্যাক্স গোছানো| এই দশ মিনিটে তিনি আবার সোফাতে ঢলে পড়ে আর একপ্রস্থ ঘুম দেওয়ার চেষ্টা চালাতে থাকেন| আমাকে কাজ সারতে সারতে মুহুর্মুহু নানা রকম হুমকি/ ধমকি দিয়ে যেতে হয়| সব বৃথা করে সে গড়াগড়ি খেতে থাকে| কাজ শেষ করে তাকে টেনে তুলে খেতে বসানো হয়| ঝাড়া পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে ক্রমাগত আবোল তাবোল খেজুরে গপ্পো করে, কখনও বা ধমক দিয়েও পুরো খাওয়ানো যায়না|
‘নে নে চটপট কর, দেরী হয়ে যাচ্ছে তো’ … ‘আরে ভুলে গেছো, আজ তো স্কুল নেই, এই উইকে স্প্রিং ব্রেক’ !!! কেলো করেছে, এটা একদম মাথায় ছিলোনা !! মনে পড়ে গেলো, সকালে বাড়ীতেই থাকবেন, দুপুরবেলা এক বন্ধুর বাড়ী তেনাকে রেখে আমাকে কাজে যেতে হবে| রাতে ফেরার পথে আবার তাকে নিয়ে বাড়ী|
এদিকে সেই সপ্তাহেই তেনার বাবা থাকছেন না, জরুরী কাজে বাইরে!! আমারও বিস্তর কাজের চাপ|
আলিস্যি ঝেড়ে জয়মা বলে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় সংসার সমুদ্রে|
স্নান সেরেই তেনার খেলাধুলোর ধুম পড়ে যায়| সারা বাড়িময় হুটোপাটি, দৌরাত্ম্য চলে| প্রায়শই আমাকেও সঙ্গত করার জন্যে চাপাচাপি করতে থাকে|
সময় চলে যাচ্ছে| তাড়াহুড়ো করে একটু চোখ বুলিয়ে নিতে থাকি সেদিনকার ক্লাসগুলোর জন্যে – ক্লাস ওয়ান মেজর হিস্টোকম্প্যাটেবিলিটি কমপ্লেক্সের সঙ্গে সিডি ফোর কো-রিসেপ্টারের ইমিউনোগ্লোবিউলিন ডোমেইনের ইন্টের‍্যাকশান যদি ম্যাচ করে তাহলে হেল্পার টি সেলগুলো অ্যাক্টিভ হয়ে…
‘মাম্মা, দ্যাখোওওও, এইযে লাইটনিং ম্যাক কুইন ক্যামন করে ফ্লাই করতেও পারে, এইযে যাচ্ছি দ্যাখো, হুউউউশশ, এবার ক্যাপ্টেন আমেরিকা এসে তো ব্রুস ব্যানারকে হেল্প করবে, বুঝেছ… ব্রুস ব্যানার কে বলো তো?’
‘অ্যাঁ, ইয়ে, ইমিউনো…’
‘ধুর, সেদিনকেই তো শেখালাম, আবার ভুলে গেছো, তুমি আমার কথা মন দিয়ে শোনোনা কখনও…’ ব্যাপারটা গাল-ফোলা দুরারোগ্য অভিমানের দিকে এগোতে চায়|
‘না, না, শুনছি শুনছি, আরেকবার বলে দে..এবার ঠিক মনে রাখবো…’
তার দিকে তাকিয়ে থেকে ঘাড় নেড়ে বোদ্ধার মতন ভাব করি আর মনে মনে ঝালিয়ে নিতে থাকি – হ্যাঁ, তাহলে সিডি এইট ওয়ালা টি সেলগুলো অ্যান্টিজেন প্রেসেন্টিং সেলের কাছে…
‘এইবার হাল্ক উইল কিল থ্যানোস কারণ হাল্ক বেশী পাওয়ারফুল…ইয়াআআআ, বুম বুম বুম… দ্যাখো, দেখছ না ক্যানো হ্যাঁ?’
নাহ, অসম্ভব… ‘আচ্ছা সোনা, তুমি এখন এঘর থেকে যাও তো, গিয়ে একটু অ্যাংরি বার্ডস খেলো, একটু পরে খেতে ডাকবো|’
নাচতে নাচতে বিদায় হয়|
অন্য ঘর থেকে অ্যাংরি বার্ডসের চুঁইইই , ইক্লাআআ, খুসসসসস, ডাঁই ডাঁইডাঁইডাঁই …ধরনের বিজাতীয় সব আওয়াজ ভেসে আসতে থাকে| তার মধ্যেই আবার সচেষ্ট হই – এস পি থ্রি ডি টু , অক্টাহেড্রাল… সালফার হেক্সাফ্লুরাইড, আরেকটা যেন কি ছিল…. হ্যাঁ, মলিবডেনাম কার্বনিল… সাড়ে এগারোটা |
এক্ষুনি খেতে বসতে হবে| আবার সেই ঝাড়া পঁয়তাল্লিশ মিনিটের পাঁয়তাড়া| তারপর নিজের খাওয়ার পালা| নিজের জন্যে এক থালায় সব বেড়ে, এক চক্কর মাইক্রো করে তাকে জামা পরতে পাঠালাম| এই কাজটা সে নিজে নিজেই করতে ভালবাসে| আমার চোদ্দ দুগুণে আঠাশ পুরুষের পুণ্যফলে এটা সম্ভব হয়েছে, নচেৎ এই খাতেও নাহোক কিছু আধাঘণ্টা বরবাদ হতোই| তাঁকে বলি ‘আমি এখন লাঞ্চ করবো, আমাকে বিরক্ত করবে না কিন্তু, কিছু দরকার হলে পরে বলবে|’ বলে খেতে খেতে কয়েকটা খাতাপত্র দেখে ফেলার চেষ্টা করি|
ব্যাস, সময় শেষ, বেরোতে হবে|
দরজার গোড়ায় দেখি তিনি বিবিধ খেলনাবাটি, বই, রং পেন্সিল ইত্যাদি মিলিয়ে এক বোঁচকা মালপত্র নিয়েছেন| সেগুলোকে ব্যাগে ব্যাগে ভরে, খাবার জল, জলখাবার, রুমাল, আমার ব্যাগ, কম্পিউটার মিলিয়ে মালের বহর দেখে মনে হল যেন দুদিনের জন্যে কোথাও বাইরে যাচ্ছি বুঝি|
তিনি নিজে কেবল জুতোটি পরে একটা ট্রেন হাতে নিয়ে বললেন, আমি অ্যালার্ম দিয়ে দিচ্ছি, তুমি বাকী জিনিস নিয়ে চটপট চলে এসো মাম্মা !! ল্যাগব্যাগ করতে করতে সব জিনিস গাড়ীতে তুলে চললাম| বন্ধুর বাড়ীতে ওনাকে নামিয়েই ছুট দিতে হবে, হাতে একদম সময় নেই|
মাইল পাঁচেক আসার পর মনে পড়লো খাতা যে দেখেছি তালেগোলে সেগুলো আনতেই ভুলেছি !! শুনে তিনি বিচক্ষণের মতন বললেন, তাতে কি হয়েছে, আমাকে ‘সুপর্নাদি-মাসির’ বাড়ীতে নামিয়ে তুমি আবার বাড়ীতে এসে খাতা নিয়ে যেয়ো !! দাঁত কিড়মিড় করে রাস্তায় মন দিই| মাথা দপদপ করছে|
ছেলেকে নামিয়ে কর্মস্থলে ঘণ্টার পড় ঘণ্টা বকে বকে মুখে ফেকো তুলে ঝিম হয়ে বেরোই যখন ততক্ষণে শরীর চাইছে ঘুম আর মগজ তো জবাব দিয়েই দিয়েছে| বেরিয়ে বাঁদিকে ঘুরেই মনে পড়ে, ওই যাঃ তেনাকেই তো নেওয়া হল না! আবার গাড়ী ঘুরিয়ে বন্ধুর বাড়ী থেকে মাল ডেলিভারি নিতে যাই|
গিয়ে দেখি সে বহাল তবিয়তে জমিয়ে খেলাধুলা করছে দাদাদের সঙ্গে| কিছুতেই আসবে না !! পরদিন আবার একই রুটিন, ভেবেই গায়ে জ্বর আসতে চায় আমার| কোনওমতে সাধ্য-সাধনা করে বাড়ী নিয়ে আসি|
রাত নিঝুম, ঘরে শুধু দু’জন প্রাণী আমরা| এমন সময়ে তিনি মনে করিয়ে দেন, ‘মাম্মা, গতবার স্প্রিং ভেকেশানে আমরা সেই যে ভুতের মুভি দেখলাম না? ক্লোসেটের উপর ভুত বসে হাসছিল, কঞ্জ্যুরিং? !! আবার দেখব হ্যাঁ?’
কী বলবো !! ভয়ে দুঃখে, হতাশায় কান্না পেয়ে যায় আমার !!! এই রাতে ওই কথা মনে না করালেই যেন চলছিল না !!
যাই হোক, আবার সেই দু’জনের দুই প্রস্থ খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে বার বাড়ীর শেষ লাইটটা নিভিয়ে দৌড় দিয়ে বেডরুমে ঢুকছি (অন্ধকার করে দিলেই কেমন মনে হয় পিছন থেকে ওই কী যেন আসছে তেড়ে, আর আমারও চলার গতি পাল্লা দিয়ে বেড়ে যায়) এমন সময়ে তেনার বাবার ভিডিও কল|
‘কী করছ বাবা, খেয়েছ? ঘুমাওনি এখনো? মাম্মা কী করছে?’
‘হ্যাঁ বাবা, তোমার খাওয়া হয়ে গ্যাছে? হাউ ওয়াজ ইয়োর ডে?’ দুপক্ষে এবম্বিধ আদিখ্যেতা চলতে থাকে খানিকক্ষণ| সারাদিনের ঘূর্ণিপাক স্মরণ করে এই আমড়াগাছিতে অংশগ্রহণ করতে একটুও ইচ্ছে করেনা আমার| সব জায়গায় সব ঠিক আছে আঁচ করে তিনি অতঃপর ভিডিও কল শেষ করে আমাদের রেহাই দ্যান| শেষ লাইটটা নিবিয়ে ঘুমানোর বিস্তর চেষ্টা করি, এখানে খুট, ওখানে খটাৎ, ছাদে খুরখুর, নানা সন্দেহজনক আওয়াজ শুনতে শুনতে অনেক পরে চোখ লেগে আসে|
এইভাবে সপ্তাহশেষে, দুঃসময় প্রায় মেরে এনেছি এমন বোধ হতে থাকে|
ফিরে সেদিন মুখী কচুর ডালনা বানাতে শুরু করি| ঘাড় গুঁজে কচু কাটি| খোসা ছাড়ালেই কচুগুলো অবাধ্যর মতন পেছল হয়ে যায়| একটু অসাবধান হয়েছ কি রক্তগঙ্গা| আমার ছুরিগুলো আবার সবকটা বড়-বড়, শান-দেওয়া ধারালো চকচকে ফলা| মানুষ খুন করা চলে তা দিয়ে| তাই এসব ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়| ইতিমধ্যে ঘাড়ের কাছে দপদপ করছে বুঝতে পেরে, রান্না কষানোর মাঝে মাঝে একবার করে শুয়ে পড়ি| বার দুয়েক পর উঠতে গিয়ে দেখি ঘর টলে যাচ্ছে, কিছুতেই ব্যাল্যান্স ফিরছে না মাথায় !! আবার হতচ্ছাড়া ভারটিগো মাথা চারা দিলো নাকী !! কোনমতে রান্না আর্দ্ধেক শেষ করেই শুয়ে পড়তে হয়| উঠলেই মাথা প্রবল পাক দিয়ে উঠছে!! ঘাড়ের কাছে দপদপ, খুব প্যাল্পিটেশান|
‘মাম্মা, আর ইউ ওকে?’ ছেলের প্রশ্নে কান্না পায় !! আমার কিছু হলে এটাকে দেখবে কে? কিছুতেই ঠিক হচ্ছে না কেন !! প্রেশার বাড়লো? কই কোনও অনিয়ম তো করিনি| গত ক’দিনে অতিরিক্ত চাপ কিছু ছিল কি? কই না তো| দিব্যি খাচ্ছি-দাচ্ছি-ঘুমাচ্ছি বগল বাজাচ্ছি, কেন এরকম হল| কেন?
প্রশ্নটা মাথায় পাক খেতে থাকে, ঠিক যেমন ঘরটা পাক খেতে থাকে চোখের সামনে, চোখ খুললেই|
বিঃ দ্রঃ – এসব বেশ ক’দিন আগের কথা, এখন সব বিলকুল ঠিকঠাক আছে| অত সহজে পটল তুলতে জন্মাইনি মশাই| বেশ ক’টাকে উচিৎ শিক্ষে দিয়ে যমের বাড়ী পাঠিয়ে তবে গিয়ে পাততাড়ি গোটানর কথা ভেবে রেখেছি| জয় মা|
 
 

রোজনামচা

পাঁউরুটি- লাল জ্যাম আর দুটো সন্দেশ,

আধ-খাওয়া মুন কেক, আঙুরের অবশেষ

আজও দেখি টিফিনের বেশীটাই খাসনি

দেখেছিস ঘুঘু শুধু, ফাঁদটা দেখিসনি?

 

এক গাল মুড়ি দুধ সেই কোন ভোরবেলা

লাফে-ঝাঁপে রসাতল হয়নি কি এইবেলা?

রোজ রোজ একই কথা, শুনি গিয়ে ইশকুলে

শতমুখে বকবক, বন্ধুরা মুশকিলে

 

(প্রথমে নরম দিই, পরে দেবো কড়কে

মারমুখী গোড়াতেই, যেতে পারে ভড়কে)

 

হ্যাঁরে, মা’র কষ্টটা কোনোদিনও বুঝবিনে?

এ জগতে আছে কে বা মা-বাবার তুই বিনে?

পেট পুরে খাওয়া-দাওয়া করে যায় যে বালক

পড়ে, শোনে, খেলে, ধুলে ঘরে আনে সে পদক

 

উপোষী যে পেট তার মগজেও ফক্কা

তেল বিনে কভু নাকি ঘোরে কোনো চাক্কা?

কাল থেকে টিফিনেতে মুখে দাও চাবি-তালা

গপগপ দু’মিনিটে শেষ করে তবে খেলা

 

ভিজে যেন বেড়ালটি, ঘন ঘন নাড়ে ঘাড়

ঠিকাছে মা তাই হবে, ভুলব না আমি আর

পরদিন যথারীতি, বখা ছেলে নয় সিধে

খেলা, ধুলো, ড্রামা, গান আছে সবই নেই খিদে

 

(এইবারও রাগবোনা? মর’গে যা, দূরছাই

গাঁক গাঁক চিল্লিয়ে, কাকচিল মূর্ছায়)

 

বেল্লিক, বান্দর, লেজকাটা হনুমান

ঘুষি মেরে ঘুশুড়িতে, কানপুরে পাবি কান

বকে চলি প্রাণপণে, বাজখাঁই শব্দ

মাথা নিচু অপরাধী,  কি, কেমন জব্দ?

 

মনে মনে ছেলে ভাবে, উফ, এ কী ননসেন্স

এটাই তো হবে জানি, নয় এ তো সাসপেন্স

ইশকুলে সারাদিনে হয় ম্যাথ নয় রীড

টিফিনের ঘরে তাই গল্পতে আনি স্পীড

 

সেথায় খাবার ফেলে সকলেই করে টক

আড্ডা তো থামেনা, টিফিন বাক্স লক

তুমি রোজই বকা দাও, ওটুকুই কাজ যে

কাল থেকে ফের আমি, রাজা মোর রাজ্যে

 

চীৎকার দ্যাখো সব, যেন টিয়া ল্যাজঝোলা

বকে মরো যত খুশী, তাতে মোর কাঁচকলা  

 

অনেক সময়ে এরকম হয় যে কোথাও গিয়ে জায়গাটা দেখে মনে হল, এখানে আগে কখনও এসেছি| খুব চেনা-চেনা লাগতে থাকে, কেমন একটা শিরশিরানি চোরা অস্বস্তির মতন ছেয়ে যায়| এরকম আমার মাঝে মাঝেই হয়, অনেকেরই হয় নিশ্চয়ই| একেকটা স্বপ্ন ফিরে ফিরে আসে প্রায় রাতে, কোন একটা জায়গা, যেখানে আগে যাইনি, ঘুমের অতলে জলছবি হয়ে ফুটে থাকে| তারপর হঠাৎ একদিন কথা নেই বার্তা নেই হয়তো এক পারিবারিক ভ্রমণকালে কোন এক অজানা বাঁকে ভুস করে ভেসে ওঠে সেই না-দেখা আশ্চর্য দৃশ্য| হুবহু যেমন এসেছিলো স্বপ্নে! কী করে এমন সম্ভব আমি জানিনা, কিন্তু এটা হয়|
যাই হোক, সে আমি না জানতেই পারি, জগতে কতো কীই তো জানিনা| তাতে মনোকষ্ট পাবার মতন আহাম্মক আমি অন্তত নই|
কিন্তু পৃথিবীতে এমন লোক আছে যারা সবকিছু জানে আর সেটা বাকী সকলকে কানে ধরে জানাতে কসুর করেনা| এই যেমন আমার দাঁতের ডাক্তারের যে নার্স আছেন উনি| সেবার গরমের ছুটিতে একদিন সন্ধ্যেবেলা আয়েশ করে এক মুঠো রোস্টেড চীনেবাদাম খাচ্ছিলাম| আচমকা কটাস করে কি যেন কামড়ে ফেললাম| ব্যাথা নেই, কিছু নেই, কড়মড় করে চিবিয়ে গিলে ফেলার সময় বুঝলাম সেটা আর যাই হোক চীনেবাদাম ছিল না ! এবার জল খেতে গিয়ে বুঝলাম দুর্ঘটনা কাকে বলে| মাত্র এক ঢোঁক জল মুখে যেতেই ফিলিং করা একটা দাঁতে কনকন করে যাচ্ছেতাই রকম যন্ত্রণা উঠে ব্রহ্মতালু অব্দি ঝাঁকিয়ে দিলো| অর্থাৎ ফিলিঙের খানিকটা চটে গেছে যেটাকে আমি বাদাম ভেবে খেয়ে নিয়েছি| পরদিন অবিলম্বে মেরামত না করলেই নয়|
এদিকে সেদিন অনেক কাজ| তাড়াহুড়ো আছে একটু| এদেশে ডাক্তারের দেখা পাওয়া ভগবানের দেখা পাওয়ার চেয়েও কঠিন| তা, অনেক কষ্টে ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝিয়ে সুঝিয়ে ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া গেলো| সাড়ে বারোটায় দেখবেন আমাকে, দেড়টার মধ্যে সারতেই হবে, কাজ আছে| আমাদের এই ডেন্টিস্ট মহাশয়ার মেলা রুগী| হামেশাই দুজনকে একসঙ্গে দেখেন!! গিয়ে দেখি যথারীতি অন্য আরেকজন রুগী এক ঘরে শুয়ে, তেনার দাঁতের মেরামতি চলছে| দশ মিনিট কেটে যাবার পর অন্য রুগীর দায়িত্ব নার্সকে দিয়ে ‘হেঁ হেঁ মৌমিতা, সরি সরি, একটু দেরী হল, কিছু মনে কোরোনা ভাই, তুমি এই চেয়ারে শুয়ে পড়ো’ বলে আমাকে পাশের ঘরে ঢোকালেন| বারোটা চল্লিশ| ডেন্টিস্টের চেয়ার কী জিনিস ভুক্তভোগী সকলেই জানেন| বসা মাত্রই শাঁ করে চেয়ার হেলিয়ে দিলেন| মুখের ওপর এসে পড়লো প্রায় হাজার ওয়াটের এক দামড়া লাইট|
‘কই হাঁ করো দেখি| এঃহে, আবার ফিলিংটা গেছে| অদ্ভুত জায়গায় ক্যাভিটি কিনা, তাই বারবার চটে যাচ্ছে, আর কারুর এরকম হতে দেখিনা’ !! এইরকম খোঁটা দিয়ে কাজ শুরু করলেন| উখো মতন কী দিয়ে ঘষে ঘষে প্রথমে রগ পর্যন্ত ব্যাথা করে দিলেন| তারপর ওই অবস্থায় আমাকে ছেড়ে ‘দাঁড়াও, ওনার সিমেন্টিংটা দেখে আসি| এই ঘরে নার্সকে পাঠাচ্ছি’ বলে, আর্দ্ধেক কামিয়ে বসিয়ে রাখার সেই চিরন্তন ফিকির খাটিয়ে উধাও হলেন| আড়চোখে ঘড়ি দেখলাম, বারোটা পঞ্চান্ন| এইবার মঞ্চে প্রবেশ করলেন তরুণী সেই সর্বজ্ঞ নার্স|
অত্যুজ্বল আলোয় চোখ মিটমিট করে দেখলাম লম্বাটে মুখ, উলটে টেনে চুল বাঁধা আর নাকের ডগায় তিনকোনা মতন জড়ুল| এসেই আমাকে দেখে চোখ গোল করে ‘আরে, তুমি সঙ্গীতা না? কোথায় যেন তোমাকে দেখেছি মনে হচ্ছে’ বলে একগাল হাসলেন| আমি তো হাঁ, মানে আক্ষরিক অর্থেও তাই| কোনক্রমে ঘুঁ ঘুঁ করে বল্লাম আমি সঙ্গীতা নই আর কস্মিনকালে আমাদের কোথাও দেখা হয়নি|
ততক্ষণে ডাক্তার আবার এখানে এসেছেন| এবার দুজনে শুরু করলেন –
‘এই দেখেছেন, এনাকে আমার খুব চেনা চেনা লাগছে| যেন কোথায় দেখেছি’
‘ওমা তাই নাকি, ও তো ইদানীংকালের মধ্যে আসেনি| তোমার ওকে দেখার কথা নয়| একেই বলে দেজা ভ্যু|’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন| দেজা ভিউ!’
‘না, ভিউ হবে কেন, দেজা ভ্যু| এটা একটা আরবি কথা’ !!! (মুখ হাঁ, ভেতরে নানা যন্ত্রপাতির কেরামতি চলছে তা সত্ত্বেও আমি খুঁত খুঁত করে ওনাদের ভুল ধরানোর চেষ্টা করি|
‘আঃ, মৌমিতা, নড়াচড়া করোনা| নাহলে কিন্তু আবার ফিলিং খুলে যাবে| হ্যাঁ কি বলছিলাম, দেজা ভ্যু আদপে বিদেশী শব্দ, ইংরিজি নয় কিন্তু’
‘হ্যাঁ, তবে আরবিও নয়| এটা হল স্প্যানিশ শব্দ, আমি কোথায় যেন পড়েছিলাম’ (ঘুঁ ঘুঁ ঘুঁ) ‘সঙ্গীতা, নড়বেন না প্লীজ’
একটা কুড়ি !!
ফিলিং প্রায় শেষ, আহত দাঁতের গোড়ায় তুলোর ঠুলি গুঁজে ডাক্তার উবাচ-
‘না, স্প্যানিশ হবে না| আমি খানিকটা স্প্যানিশ জানি তো| এই, জানো তো, অমুকের মেয়ে এক স্প্যানিশ বয়ফ্রেন্ড জুটিয়েছে| দেখতে শুনতে ভালোই, কেবল ওর কাকা নাকি ড্রাগ লর্ড| ভাবো একবার কাণ্ডটা| নাও, সাকশান দাও এদিকে|’
ক্রি ঈ ঈ ঈ ঈ আওয়াজে কানে তালা ধরিয়ে পালিশ করা চলছে|
‘ওমা তাই নাকি, বলেন কী, আজকালকার মেয়েগুলো সব… স্প্যানিশ না, আমার এখন মনে পড়ল, এটা আসলে এসেছে গ্রীক থেকে| ভিউ অর্থাৎ দৃশ্য, দেজা মানে মনে পড়ছে না’
এরপরে যদি আর থাকতে না পেরে তুলো- ফুলো ফেলে এনাদের খেজুরে বাধা দিয়ে খ্যাঁক করে উঠি তাহলে কি আমাকে দোষ দেওয়া যায়? অবশ্যি এর ফলে ওই পালিশ যন্ত্রের খোঁচা লেগে গালের ভেতর বেশ খানিকটা ছড়ে গেছিলো|
এর অনেকদিন পরের কথা| বছরের এই সময়টা দুর্গাপুজো, লক্ষ্মীপুজো, কালীপুজো ইত্যাদির পর আমাদের বাড়ীতে হয় জীবাণু পুজো| দুর্গা পুজোর পাঁচদিনের পর নিয়ম মেনে ভাইরাসের এক হপ্তা, ব্যাক্টিরিয়ার দু হপ্তা এরকম চলে| পুজোর পরেও এনারা বিদায় নিতে না চাইলে তখন যোগ্য পুরোহিত অর্থাৎ ডাক্তারের কাছে গিয়ে ধর্না দিতে হয়| তাই গেছিলাম| ছেলের নাক দিয়ে কর্পোরেশানের প্যাঁচ কাটা কলের মতন জল পড়েই চলেছে আর তার সাথে- সারাদিন-রজনী অনিমিখা, কাশির শব্দে জাগে প্রতিবেশী|
ডাক্তারের আগে নার্স এসে জ্বর, ওজন, উচ্চতা, রক্তচাপ, শিকনির ঘনত্ব ইত্যাদি হাবিজাবি মেপে যান এখানে| নার্স এলেন| লম্বাটে মুখের গড়ন, উলটে টেনে বাঁধা চুল, নাকের ডগায় তেকোনা জড়ুল !! আমাকে দেখেই চোখ বড় করে ‘এই তুমি…তুমি…’
আমার দাঁত শিরশির করে উঠল, অজান্তেই গালে হাত চলে গেলো একবার…আমাকে দেখে ওনার যা মনে হচ্ছিলো, আমারও ওনাকে দেখে অবিকল সেইরকম হচ্ছিলো তখন… ঠিক ধরেছেন, দেজা ভ্যু 😦

সুহানা সফর

– যাবেন? পাটুলি যাবো।..

-হ্যাঁ, তবে বি টি রোডে খুব জ্যাম।..যশোর রোড দিয়ে যাবো।..
-ঠিক আছে, তাই সই…চলুন
ট্যাক্সি স্টার্ট হলো….
-আচ্ছা দাদা, কদিন থেকে পেটটা ভালো যাচ্ছে না…মাঝে মাঝে কনকন করছে আর তারপরেই পাতলা পায়খানা।..কি ওষুধ খাবো একটু বলতে পারেন?
-আমি বলবো! তা, মেট্রোজিল ধরণের কিছু খেয়ে দেখতে পারেন।..ডাক্তার দেখিয়ে নেওয়াই ভালো
– ডাক্তার দেখিয়েছিলাম।..ওই আপনি যা বললেন সেটাই দিয়েছে। ..লিক্যুইড অবশ্য, ট্যাবলেট দেয়নি।…আসলে কেমন বলুন তো, জলের মতন না, শিন্নি টাইপের হচ্ছে।..
-ঠিক আছে, ঠিক আছে….আপনি ওষুধ খান, সেরে যাবেখন
-সারাদিন বসে থাকার কাজ তো, হজমের গোলমাল হওয়া স্বাভাবিক।….প্রতিদিন ধরুন চোদ্দ থেকে পনেরো ঘন্টা বসে থাকতে হয়…জল খাওয়া হয়না তেমন।..
-হ্যাঁ, জল খাবেন খুব
-জলের বোতল রাখি সঙ্গে, এই দেখেন। ..খাওয়া দাওয়ার ঠিক নেই…হাবিজাবি খাওয়া হয়ে যায়…ব্যারাকপুরের দাদা-বৌদি বিরিয়ানী তো বন্ধ হয়ে গেলো, শুনেছেন?
-তাই নাকি!!! জানিনা তো…
-প্রচুর কালো টাকা উদ্ধার হয়েছে।..হাঁড়ির মধ্যে, জলের ট্যাঙ্কির মধ্যে, তিন কোটি টাকা লুকিয়ে রেখেছিলো।…ভাবতে পারেন!!!
-বাবা, তাই নাকি!!!
-হ্যাঁ , এইবার সব একে একে ধরা পড়বে। ..মোদী বাবা যা করেছে একদম ঠিক কাজ করেছে।..সব টাকা বাতিল, নে মর এবার।…কেউ ছাড়া পাবেনা , সব ব্যাটা ফাঁসবে দেখুন না আপনি।..
-বটে?
-সেদিন ভোরবেলা তো দু বস্তা নোট ফেলে দিয়ে গেছে ময়দানে।..কুচি কুচি করে কেটে রেখেছে, যাতে নম্বর না পড়া যায়…কাগজ কুড়ানি দেখতে পেয়ে থানায় জমা দিয়েছে।..
-বাপস , আপনি জানলেন কেমন করে?
-দাদা, আমরা ট্যাক্সি চালাই।..সব খবর রাখি।…আচ্ছা, আপনাদের পার্সোনাল গাড়ি নেই? ট্যাক্সি নিয়েছেন যে…
-আমরা এখানে থাকিনা তো, গাড়ী নেই….
-আচ্ছা আচ্ছা, কোথায় থাকেন? গুজরাতে ?
-না…
-তাহলে কোথায় থাকেন?
-আমেরিকাতে। ..
-সেখানে তো খুব গন্ডগোল হলো না কদিন আগে?
-না তো, সেরকম তো কিছু হয়নি
-ঐযে একটা বাজে লোক, খুব ঝ্যামেলা পাকিয়েছে ওখানে।..জানেন না?
-খ্যালা? হ্যাঁ, আমি ফুটবল খেলা খুব ভালোবাসি।..আপনি কোন দলের সাপোর্টার?
-খ্যালা না, খ্যালা না…বলছি ঝ্যামেলা। ..ঝ্যামেলা হয়েছে।..
-ও আচ্ছা। …ওখানে কদিন আগে ইলেকশন হয়েছে, একটা লোকের জন্যে একটু গোলমাল হয়েছে ঠিকই, তবে তেমন কিছু তো না…
-না না ইলেকশন না…ওই লোকটা।…কি যেন নাম, হ্যাঁ।, ওই ওসামা বিন লাদেন, ও আমেরিকাতে দুটো বিল্ডিং উড়িয়ে দিয়েছে না? সেই নিয়ে তো যুদ্ধ হলো…বেশ হয়েছে, দিয়েছে মুখে ঝামা ঘষে….খুব বেড়ে গেসলো।..
-হক কথা , বাড়াবাড়ি করলে এরকমই হয়…তা সে তো অনেক বছর আগেকার কথা…এখন সব ঠিক আছে…
-লোকটাকে পেয়েছে? ওই লাদেন।..পেলে একেবারে শেষ…
-হ্যাঁ, শেষই হয়েছে, মেরে ফেলেছে লোকটাকে।..
-যাক, নিশ্চিন্ত।….আচ্ছা দাদা, আমেরিকাতে পচুর বাঙালী না?
-হ্যাঁ , আছে বেশ অনেক বাঙালী
-ঠিকই করেছে।..এখানে কলকাতায় কিস্যু নেই বুঝলেন।..আছে শুধু ফ্ল্যাট, প্রোমোটারি, আলুচ্চপ, বেগুনি-মুড়ি।..এখানে কোনো উন্নতি হবেনা কারোর !!! মুখেই বড় বড় কথা…ভেতরে সব বেবাক ফাঁকা।..
-সেই তো, ঠিকই তো
-আমি বাইরে অনেক জায়গায় ভালো ভালো চাকরির অফার পেয়েছিলাম জানেন।..মা’কে ছেড়ে যাবোনা তাই থেকে গেছি।..লোভ করে কি লাভ বলুন।..ভালোই আছি….
-হ্যাঁ , আর কি চাই…
-এই শীতের সময়ে অনেক পেশেন্ট আসে…ট্যাক্সিতে হাসপাতাল নিয়ে যাই…তাই, ছেলেকে একটা এম্বুলেন্স করে দেবো বলে রেখেছি।..অনেক লাভ…এখন ও এন্টার্টিকা চালায়।..
-সেটা কী ?
-গাড়ির মডেল।..বড় গাড়ী।…এইযে দেখছেন রুবির সিগন্যাল, এখানে কী হচ্ছে সব থানায় বসে বড়োবাবু দেখতে পাচ্ছে।..ভুল করলেই ধরবে।…হে হে, পালানোর উপায় নেই…
-রেড লাইট ক্যামেরা আছে
-জানিনা।..একবার ছেলেকে ধরেছে সিগন্যাল ব্রেক করেছে বলে…আমি থানায় গিয়ে বললাম, ও যেমন ড্রাইভার স্যার ও রেড লাইট টপকাবে না….তখন আমাকে বললো দেখবেন আপনার ছেলে কি করেছে? বলে ভিডিও দেখালো !! আমি তো চুপ, বললাম আচ্ছা স্যার, আপনিই ঠিক বলেছেন।..ফাইন দিতে হলো…
-এইখানে এইখানে, বাঁয়ে দাঁড় করিয়ে দিন…
-এসে গেছে? আচ্ছা দাদা, খুব ভালো লাগলো আপনার সাথে গল্প করে…এই আমার নম্বর রাখুন।..ফেরার সময়ে একটা ফোন করে দেবেন, চলে আসবো
-না না সেকী!! আপনি আমাদের জন্যে ওয়েট করবেন কেন…প্যাসেঞ্জার পেলে চলে যাবেন।..
-ঠিক আছে দাদা, দেখা হবে আবার।..হে হে

পরিশিষ্ট- ফেরার সময়ে তাড়া ছিল, ওনাকে ডাকা হয়নি ।..উনি কিন্তু পরে ফোন করে খোঁজ নিয়েছিলেন আমরা ঠিকমতো পৌঁছে গেছি কিনা।..
এ শহরের যা কিছু খারাপ সমস্ত ছাপিয়ে মনে থাকবে আমাদের এই একদিনের গল্পবিশারদ সারথিটিকে 🙂

হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশ

“মাম্মা, মাম্মা, মাম্মা আ আ আ, আজকে তুমি আমার আগেই এসে গেছো| কী মজা”
তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে লাফাতে তেনার গৃহ প্রবেশ ঘটলো|
মাম্মা দাঁত কেলিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে স্বাগত জানালেন, তারপর একপ্রস্থ গলাগলি| আহা বেচারা ছোট মানুষ, সারাদিন ইশকুল করে ক্লান্ত, এইটুকু আদিখ্যেতা করাই যায়| কিন্তু, কিন্তু …
“আরে, সোয়েটার কোথায়, শুধু শার্ট যে !!”
“ওটা তো ক্লাসে খুলে রেখেছিলাম, আনতে ভুলে গেছি| সত্যি বলছি, ক্লাসেই আছে, কালকে আনব, প্রমিস|” আবার মাম্মাকে জড়িয়ে ধরতে উদ্যত হয় (হতচ্ছাড়া সোয়েটারের জন্যে এমন বিরলতম সৌভাগ্য মাটি করতে চায়না)
“ছাড় ছাড়| উফ| আবার হারালি| কালকেই তো কতো কষ্ট করে খুঁজে আনলাম”
মনে পড়ে গেলো কতো কাঠখড় পুড়িয়ে গতকাল হারানো সোয়েটার উদ্ধার হয়েছিলো| এই ইয়ুনিফরমের সোয়েটারগুলোর যাচ্ছেতাই বেশী দাম| তাই প্রথম দিনেই কালি দিয়ে সকলে যার যার সোয়েটারে নাম লিখে নিয়েছিল, আমিও লিখে দিয়েছিলাম| সেদিন পইপই করে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিলো যেন কিছু ওখানে রেখে না আসে| যা যা নিয়ে যাচ্ছে সেগুলো ফেরত আনা আবশ্যিক, ইত্যাদি| তা প্রথমদিন সবই এনেছিল| এমনকি একটার জায়গায় দু-দুটো ওয়াটার বটল এনে ফেলেছিল !! যারটা এনেছে, তার আর তার মায়ের দুর্ভোগের কথা ভেবে পরদিনই গিয়ে সেটা ফেরত দিয়ে আসি আমি!!
কিন্তু সোয়েটার হারানো সেই প্রথম| যাই হোক, আমি তাকে নামিয়ে পিছু পিছু ক্লাসে গেলাম, দিদিমণি বললেন, সেখানে নেই, অন্য কেলাসে দেখতে| আবার স্কুল বাড়ীর এক পাক ঘুরে অন্য কেলাসে গেলাম| তাঁরা বললেন সেখানে নেই, ক্যাফেটেরিয়ায় হয়তো ফেলে এসেছে, সেখানে একবার দেখতে পারি| ছুটতে ছুটতে গেলাম ক্যাফেটেরিয়া (আমারও তো কাজকম্ম আছে, নাকী !!), সেখানে আরও অনেক অবিমৃশ্যকারী বাচ্চার ফেলে যাওয়া সোয়েটার একটা বড় র‍্যাকে সারি সারি টাঙ্গানো ছিল| উলটে পাল্টে সবকটা দেখলাম| নাহ, সেই আমার মুক্তাক্ষরে ‘অভি’ লেখা সোয়েটারটি নেই !!
এবার দিদিমণি বললেন, তাহলে যাও সেএএই যেখানে ছোটদের ইশকুল বসে, ওখানেও এরকম আরেকটা র‍্যাক পাবে, সেখানে আছে হয়তো| দাঁত কিড়মিড় করতে করতে ছুট দিই সেদিকে, অনেকটা দূর| যেতে যেতে রাস্তায় পড়ে ওদের খেলার মাঠ| অর্থাৎ দোলনা, ঢেঁকি, বাস্কেটবল এসব ওয়ালা একটুখানি পার্ক মতন| সেটা একটা লোহার তারজালি গোছের বেড়া দিয়ে ঘেরা (কেমন জনতা সেখানে খেলা করে দেখতে হবে তো !! এদের আটকাতে ওই ছাড়া উপায় নেই)| সেই বেড়ার একটা ফুটোয় দেখি মেরুন রঙের এক পিস সোয়েটার কোনমতে গুঁজিয়ে রাখা !! দৌড়ে কাছে গিয়ে সেটাকে বের করে দেখি, হ্যাঁ, এটাই মূর্তিমানের সোয়েটার !! খেলতে খেলতে গরম লাগায় ওখানেই খুলে গুঁজে চলে গেছেন শাহেনশা!! মনে মনে মুন্ডুপাত করতে করতে সেটা নিয়ে গিয়ে পরিয়ে এলাম (যে ঠাণ্ডা পড়েছে, ইতিমধ্যেই কাশি, ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ শুরু হয়ে গেছে)|
এটা গতকালই হয়েছে, আবার একই কীর্তি, কাঁহাতক পোষায় মানুষের !! ফের সোয়েটার হারানোর অপরাধে দু ঘা দিয়েই দেবো ভাবছি এমন সময়ে হাতে টিফিনের ব্যাগ ধরিয়ে দিলো|
হাসি হাসি মুখ|
“কী ব্যাপার রে?”
খুলে দেখি কিমাশ্চর্যম !! ব্যাগে লাঞ্চের বাক্স একদম খালি ! সব খেয়েছে| উফ, ভাবা যায় !! এই প্রথম| আরও কী, লাঞ্চ বক্স, স্ন্যাক বক্স, জলের বোতল, সব এনেছে, স অ অ অ ব !! এতো কিছু একসঙ্গে আগে দেখিনি|
এই অভাবনীয় সৌভাগ্যে আনন্দে আমার চোখে জল এসে যায়|
“ভেরি গুড সোনা| আমি খুব খুশী হয়েছি”
উত্তরে হেঁ হেঁ করে একটু ঘ্যাম নিয়ে তিনি যান স্নান করতে|
তারপর মহানন্দে আড্ডা দিতে দিতে আমাদের তিনজনের চা-দুগ্ধ-বিস্কুট ইত্যাদির আসর শেষ হয়|
এবার হোমওয়ার্কের পালা| কী বলবো, এইটুকু বাচ্চাদের রোজ তিন পাতা করে হোমওয়ার্ক দিচ্ছে, জমা না দিলে কৈফিয়ত| আর সেইসব মহামূল্যবান পৃষ্ঠা সংরক্ষণের জন্যে প্রত্যেককে নাম লেখা এক-একখানি ফোল্ডার দিয়েছে পাঠশালা থেকে !! ফোল্ডারের মাধ্যমেই হোমওয়ার্কের আদান প্রদান হয় রোজ|
“এই দ্যাখো, আজকে কী করেছি” বলে ব্যাগ খুলেই বোম্বাচাক!! হোমওয়ার্ক ফোল্ডারটাই নেই, হারিয়ে এসেছে !!!!
সাঙ্ঘাতিক রেগে ফেটে পড়তে গিয়েও হেসে ফেলি হঠাৎ… মরুক গে যাক, একদিন হোমওয়ার্ক না করলেও মহাভারত শুদ্ধ থাকবে| বালাই গেছে|
“চল একদান লুডো খেলি বরং”

অষ্টমীর পুণ্যস্নান

অষ্টমীর ভিড়ে নিরন্তর খাবি খেয়েও পেট না ভরায় আমরা সকলে বাইরে বসে খোক্ষসের মতন খাওয়া দাওয়া করছিলাম| প্রহ্লাদকুল, ইয়ে, শিশুরাও ছিলেন সেখানেই| তেনাদের অনেক সাধাসাধি করে কিছু খাওয়ানো গেলনা| উপরন্তু খানিক পরেই ‘আমরা ভেতরে যাই?’ বলে অনুমতির তোয়াক্কা না করে দৌড়ে গিয়ে ঢুকলেন হলের ভিড়ে| তাই আঁচল, জলের বোতল, বাহারি ব্যাগ, হীল জুতো সামলে দৌড়তে হল আমাকেও| পরের ডিউটি ছিল দুই বিচ্ছুকে একটু বাথরুম ঘুরিয়ে আনা| কারণ, কে না জানে এনারা সময় থাকতে কিছু বলেন না, চৌবাচ্চা একেবারে উপচে পরার উপক্রম হলে ‘আমার এক্ষুনি পিপি পেয়েছে, এক্ষুনি, এক্ষুনি’ বলে চারদিকে একেবারে আতঙ্ক সৃষ্টি করে ফ্যালেন| তা, নিয়ে গেলাম|
একজনের হাতে ছিল খাওয়ার জলের বোতল, সেটা নিয়েই ঢোকার উপক্রম করছিলেন| তা তো করতে দেওয়া যায়না, তাই সামনে দুজন সজ্জন ভদ্রলোককে পেয়ে তাঁদের হাতে বোতল সমর্পণ করে একটু দাঁড়াতে বলে ভেতরে ঢুকলাম|
অষ্টমীর দিন খেলার জন্যে এনারা বাড়ী থেকে নিয়ে গেছিলেন ক্যাপ্টেন অ্যামেরিকা আর স্পাইডারম্যান| কার্য-সমাধা, খুদে পাজামার দড়ি-বন্ধন ইত্যাদি সারা হওয়ার পর ভেতরেই একজন আমাকে আমার শাড়ী নিয়ে কতিপয় প্রশ্ন করছিলেন| প্রশংসা শুনতে কার না ভালো লাগে, আমিও একটু হেঁহেঁ করছিলাম| দু মিনিট হতে না হতেই হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি ক্যাপ্টেন অ্যামেরিকা আর স্পাইডারম্যানের অবস্থা খুব করুন| দুই মূর্তিমান মিলে হাত ধোয়ার লিকুইড সাবান দেদার চিপে চিপে বের করে তাদের গায়ে মাখিয়েছে আর এরপর রাশি রাশি জল দিয়ে সুপারহিরোদের স্নান করানো চলছে !!! সাধের পাঞ্জাবীর হাতা, ফ্যান্সি জুতো সবকিছুর বারোটা তো বেজেইছে, সুপারহিরোরাও চান করে কেমন সেঁতিয়ে গেছে দেখলাম| সেদিন সকালেই যে রাজদীপদা বচ্ছরকার দিনে কথায় কথায় বকাবকি করতে বারন করে দিয়েছিল, সে কথা বেমালুম ভুলে গেলাম| খ্যাঁক খ্যাঁক করতে করতে দরকারি মেরামত সব করে গলদঘর্ম হয়ে বেরোলাম|
বেরিয়ে দেখি যাঁদের জিম্মায় বোতল রেখে গেছিলাম তেনারা খুব উদ্বিগ্ন হয়ে মহিলা বাথরুমের পানে চেয়ে আছেন| যা সময় লাগছিলো তাতে দাঁত মাজা, কাপড় কাচা, স্নান, বাথরুম পরিষ্কার সবই হয়ে যাওয়ার কথা কিনা| অত্যন্ত অপ্রস্তুত হয়ে তাঁদের প্রভূত ধন্যবাদ জানিয়ে বোতল নিয়ে ঘুরে দেখি এনারা ততক্ষণে পুনরায় ভিড়ের মধ্যে অদৃশ্য হয়েছেন|