এক একটা দিন

 

এক একটা দিন মেঘ ছেয়ে যায় দিগন্ত জুড়ে

অ্যালার্ম বাজে নিজের মতন,

চোখের কপাট খোলে নিয়মমাফিক,

মেঘ-লাগা কোষে, ইন্দ্রিয়ে, সকাল হয়না

 

এক একটা দিন বেভুল বেপরোয়া পা চালাই

রাস্তা গুঁড়িয়ে যায় কদম কদম

এলোমেলো ঢলানি হাওয়া আছড়ায় আমার মোটা চামড়ায়

জোরে আরও জোরে হাঁটি, রাস্তা ফুরোয় না

 

এক একটা দিন দাঁড়িপাল্লায় মানুষ মাপি এপাল্লা, ওপাল্লা

ওজন করে মরি দিনমান  কী নেই, কী ছিলোনা,

থিয়োরি লিখি, পাতার পর পাতা ভরে হিজিবিজি প্রলাপেরা ঘর বাড়ী বানায়

অকাজের অপদার্থ অন্ধকার দিন বয়ে যায়, হিসেবগুলো মেলেনা

 

এক একটা দিন আমার ভীষণ ভালবাসা পায়

বুক নিংড়ে দিতে ইচ্ছে করে, দেবশিশুর গাল, মুখ, কপাল চুমুতে ভরিয়ে দিই

মধু-মধু লাগে, চটচট করে সারা শরীর, আবেশে ঝিম ধরে যায়

মুহূর্তেরা পালায় একে অন্যকে তাড়া করে, অভিশপ্ত সময় তবু পাল্টায় না

 

এক একটা দিন দুয়ারে আগল আঁটি, পেরেক ঠুকি, বন্ধ করি, আগলাই

খাঁচায় এদিক-ওদিক, ওদিক-এদিক পায়চারী করে ক্রুদ্ধ জোড়া পা

ভয়ে কুঁকড়ে যেতে যেতে ভাবি, আর না, এই শেষবার

আগল ঠেলে হইহই করে বসন্ত ঢুকে পড়ে, আরও একবার, যাওয়া হয়না

 

এক একটা দিন কুয়াশামুখোশে কান মাথা ঢেকে বেরোই বাড়ী থেকে

চেনামুখ দেখে লুকোই, মূক-বধির-অন্ধ সেজে দিন কাটিয়ে দিই

জামার বোতাম সাপটে লাগাই, কেউ দেখে ফেললো না তো?

কেউ বুঝে ফেলছে না তো?

 

এক একটা দিন নিষ্ফল রাগে রাত ছিঁড়ে ফেলি ফালা ফালা করে

কেন কেন কেন, আমি কেন?

ভুল বিশ্বাসে ভরপুর, ন্যাকা-আদুরে মজ্জায় কাঁপন লাগে,

‘দূর মুখপুড়ি, ঘুমিয়ে পড়’, অভ্যস্ত আরাম উত্তর দেয়না

 

এক একটা দিন হিংসে হয় আমার ভীষণ হিংসে

সবুজ, হিসহিসে, অ্যাসিডিক হিংসে, আস্তে আস্তে যত্ন করে পোড়ায় অন্তঃকরণ

আমার প্রাণপণ মুঠো গলে বালিসুখ পড়ে যায় ভাগ্যবানের আঁচলে

ফ্যালফ্যাল, মরা মাছের চোখে তাকিয়ে থাকি, কেউ ঘরে ফেরেনা

 

এক একটা দিন কাঁচদুটো মুছি বারবার, চশমা পরিষ্কার হয়না

এক একটা দিন …

 

Advertisements

দোলগোবিন্দর বিপদ

তা দোলগোবিন্দ বাবু স্ত্রী-পুত্র নিয়ে গেছিলেন চিড়িয়াখানা। বারোমাস বাইরে বেরোলে তিনি সঙ্গে একটা মার্কামারা কালো বোঁচকা পিঠে করে নিয়ে যান যাকে ভদ্র ভাষায় বলে ব্যাকপ্যাক। বলা যায়না, হঠাৎ যদি ভূমিকম্প হয়ে কোন খোঁদলে আটকা পড়েন, কিম্বা যদি জলোচ্ছ্বাসে পৃথিবী রসাতলে যাবার উপক্রম হয় ও দুষ্টু জল এনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, কিম্বা যদি মাঝরাত্তিরে তেপান্তরে গাড়ী খারাপ হয় ও এনাকে একলা সেখানে রাত কাটাতে হয়, কিম্বা যদি ভিনগ্রহের প্রাণীরা পৃথিবী আক্রমণ করে ও এনাকে পালিয়ে গিরিকন্দরে দিনের পর দিন আশ্রয় নিয়ে লুকিয়ে থাকতে হয় তাহলে যা যা লাগতে পারে, তার সবকিছুই এই বোঁচকায় মজুত থাকে। এক প্রস্থ জামাকাপড়, চিরুনি, জ্যাকেট, টুপি, ছোট কেক, বিস্কুট, চিরেভাজা, সানস্ক্রিন, চিউইংগাম ইত্যাদি এবং সর্বোপরি থাকে দুই থার্মোফ্লাস্ক ভর্তি জল। একুনে নাহক কিছু চোদ্দ পনেরো কেজি ওজন তো হবেই। যে কোনো জায়গায় গিয়ে নেমেই এই বোঁচকা পিঠে নিয়ে নেন ও সারাক্ষণ পিঠে করে ঘুরে বেড়ান। কোনওভাবে ওনার ধারণা জন্মেছে যে এই করে ফোকটে বেশ খানিকটা ব্যায়াম হয়ে যায়। ওরে পাগলা, সকালের এক ইঞ্চি পুরু মাখন দেওয়া পাঁউরুটি, কলা, মালাই-চা, তারপর দুপুরে কোম্পানির ঘাড় ভেঙে কোনোদিন ইটালিয়ান, কোনোদিন চাইনিজ, কোনোদিন ইরানী, পাকিস্তানি, মেক্সিকান হ্যান ত্যান, তারপর বিকেল হতেই চা লেরো বিস্কুট এবং রাতে একপো চালের ভাত সহযোগে পঞ্চব্যাঞ্জন কি আর সামান্য বোঁচকা বইলেই হজম হবে? তার জন্যে আরও কায়দার দরকার। যাই হোক, কে বোঝাবে।

তা বোঁচকা নিয়ে নিয়ে সর্বত্র ঘোরার পর একজায়গায় ‘ক্রেজি হাউস’ নামের এক ব্যাঁকা-ট্যারা বাড়ীর সামনে এসে হাজির হলেন। এখানে বাচ্চারা হঠাৎ প্রবল উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটে উঠল। বাড়িটা দোতলা, আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে আড্ডা- টাড্ডা দিচ্ছিলাম, ততক্ষণে বাচ্চারা সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলো কলরব করতে করতে। খানিক পরেই তাদের ক্যালর ব্যালর শোনা গেলো নীচতলার সম্পূর্ণ অন্য দিক থেকে !! কেসটা কি সরেজমিন করতে আমি সেদিকে গেলাম, যাবার সময় দেখে গেলাম যে বাচ্চারা দোলগোবিন্দ বাবুকে বগলদাবা করে কি যেন বুঝিয়ে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে গিয়ে দেখি বাড়ীর দোতলা থেকে একটা সুরঙ্গ এঁকেবেঁকে  মাটির হাত খানেক ওপরে এসে শেষ হয়েছে। বেশ লম্বা পতনের পথ আর কি। বাচ্চারা সেই পথেই দোতলা থেকে নেমে এসেছে বোঝা গেলো, সেই জন্যেই তেনাদের এতো আনন্দ !! সুরঙ্গ দিয়ে ছোট ছোট সাইজের বালক বালিকারা অহরহই সাঁই করে নেমে আসছে ও দ্বিগুণ উৎসাহে আবার অন্যদিকের সিঁড়ি দিয়ে উঠে যাচ্ছে। যাক, সেই সুরঙ্গের অনতিদূরে দাঁড়িয়ে ফুল-পাখি- প্রজাপতি এসব দেখছি একমনে, গলায় গান আসবো আসবো করছে, এমন সময়ে, গদাম !!! সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে যা ঘটতে দেখলাম তা হল – দোলগোবিন্দ বাবুর সেই বিকট ভারী বোঁচকাটা হুউশ করে সুরঙ্গ দিয়ে উড়ে এসে মাটিতে পড়লো। যেহেতু দোলগোবিন্দবাবু ওটাকে কাছছাড়া করেননি, তাই বোঁচকার ওপর চিৎপাত অবস্থায় ছিলেন তিনি স্বয়ং। অর্থাৎ, পিঠে বোঁচকা অবস্থায় চিৎপটাং হয়ে শুয়ে তিনি উল্কার বেগে সুরঙ্গ বেয়ে এসে বিকট আওয়াজ করে ধুলোর ওপর ভূমিষ্ঠ হলেন!! বাচ্চাদের জন্যে বানানো সুরঙ্গে সোজা হয়ে বসতে পারেননি, তাই শুয়ে পড়তে হয়েছে, এবং পিঠে জন্মের ভারী ব্যাকপ্যাক থাকায় মোমেন্টামটা জম্পেশ রকম হয়েছে, তার ফলে এই মহাপতন ও কেলো।   দু সেকেন্ড সব চুপচাপ, দোলগোবিন্দ কিছু হয়নি এমন ভাব করে মাজা সামলে উঠতে গিয়ে দেখলেন সামনের পিকনিক বেঞ্চ থেকে সরু মোটা নানা গলায় ফিক ফিক, ফ্যাকর ফ্যাকর, হি হি, হা হা, হোহো, খ্যা খ্যা, খিক খিক ও খৌয়া খৌয়া সমবেত হাসাহাসি শোনা যাচ্ছে। বিনি পয়সায় এমন বিনোদন তো সহজলভ্য নয়। এবং সামনেই সবথেকে হেঁড়ে গলায় হ্যাহ্যাহ্যাহ্যাহ্যা করে হেসে প্রায় লুটিয়ে পড়ে যাচ্ছে যে, সে আর কেউ নয় তাঁর অগ্নিসাক্ষী করে বিয়ে করা বিশ্বাসঘাতক স্ত্রী। পাক্কা সাড়ে ছ’মিনিট পর কোনওমতে দম নিয়ে সে জিজ্ঞেস করলে, ‘কোথাও লাগেনি তো?’

কোন মানে হয়? অ্যাঁ?

 

পয়লা বৈশাখ

খ্যানখ্যান অ্যালারামে ঘুম গেলো ভেস্তে

হাই তুলে আকাশেতে চোখ অতি কষ্টে

সেই বুড়ো হলদেটে ঘোলা রঙ ঝলসায়

কালকে যেমন ছিল হয়নিকো নয়ছয়

 

মুখখানা ভেটকিয়ে এক ঢোঁক জল খাই

গলা ব্যাথা ক্যাঁক করে চেপে ধরে টুঁটিটাই

লেপ ঠেলে কোনওমতে নামি যেই ধরাতে

পুরনো মাজার ব্যাথা সেও আসে জ্বালাতে

 

আয়না খবর দেয় ছিরিমুখে ছাঁদ নেই

গলকম্বল আছে, নাক বাঁকা বাঁদিকেই

তবু আজ দিন ভালো, কিছু বলা যায়না

কখন সে জাদু হবে? মন করে বায়না

 

প্রাণ ভরে খাওয়া চাই কষে ভাল মন্দ

আর যাই ঘটুক না, এতে নেই দ্বন্দ্ব

অতএব লুচি আসে, আসে আলু চচ্চড়ি

ঘণ্টাখানেক বাদে অম্বল বিচ্ছিরি

 

দলে পড়ে পেট সেও পালটাতে চায়না

হোক না বিশেষ দিন, পাত্তা সে দেয়না

বচ্ছরকার দিনে ভাত মেখে সাপটে

ঝোলে, ঝালে দিবানিদ বালিশটা জাপটে

 

বিকেল গড়িয়ে যায় রোজকার মতনই

অতিথ আসার কথা, সাজে চাঁদবদনী

গমগম আড্ডায় চায়ে – ডালপুরিতে

পরকীয়া-কানাকানি হাসাহাসি তুড়িতে

 

নেমে আসে আরও এক রোজকার মত রাত

দিনভর মচ্ছবে আদুরে বাঙালী কাত

ফি বছর বিনোদন বাঁধা গতে ঘুরপাক

বুড়ি চাঁদ ম্লান হাসে তারারাও নির্বাক

 

হলদেটে ঘোলা আলো ফের আধোঘুম ফাঁক

ফিক করে হেসে ফেলে দোসরায় বৈশাখ ||

 

কা তব কান্তা ইত্যাদি

দরকারের সময় কি কাউকে পাওয়ার যো আছে? এইযে বিগত বহুদিন ধরেই আমার শরীরটা ঠিক জুতের নেই, তাতে পৃথিবীর কোন হেলদোল আছে? নেই।
কে না জানে আমি কী পরিমাণ হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে, উদয়াস্ত মাথার ঘাম জুতোয় ফেলে (শীতকালে আমি পারলে জুতো পরে শুই) দু- পাঁচ আনা উপার্জন করি, তাতে যদিও হাতি-ঘোড়া কেনা চলে না, তবু খাটনি তো। শুধু তাই না, এরপরেও আবার রান্না করি, ঘর গোছাই, ছেলে মানুষ করি, বাজার দোকান করি, আবদার কতো অ্যাঁ?
তা, দিন গেলো আলে ডালে, তারপর এই হাড় হিম করা বিতিকিচ্ছিরি শীতের শেষে নামল তেড়ে বৃষ্টি। সে কী বৃষ্টি আর হাওয়া রে ভাই। গায়ে তিন পুরু সোয়েটার, জ্যাকেট, মাফলার, ইত্যাদি চাপিয়েও ঠাণ্ডায় হিহি করে কাঁপতে কাঁপতে রোজ সকালে হাজিরা দেওয়া কি মুখের কথা!! আবহাওয়ার এই আকস্মিক অবিমৃশ্যকারিতায় যা হওয়ার তাই হল। সারাদিন ছোট-বড়-মেজ নানান সাইজের নাসিকা-নির্গত ক্রমাগত মিসিসিপি-মুসুরি এবং হ্যাঁচ্চো। আর ক্লাসময় সমবেত সরু-মোটা-মিহি কণ্ঠ নির্গত খক-খক এর ফলে আকাশে বাতাসে যে অযুত নিযুত সংখ্যক ভাইরাসকুলের সমাবেশ হল তার থেকে বাঁচতে আমার মতন ঘোর বেনিয়মী পাষণ্ড পর্যন্ত কালেভদ্রে হাত-পা ধুচ্ছিল নিয়ম করে। কিন্তু নিয়তি কেন বাধ্যতে।
লুকোচুরি খেলতে খেলতে ওই বেয়াদব ভাইরাসদের মধ্যে একজন আমাকে ধাওয়া করে ঠিক ধরে ফেললেন। মানে ‘আই নেভার ট্রায়েড টু ক্যাচ কোল্ড, ইট কট মি’ আর কি। অতঃপর এক বৃষ্টিস্নাত মঙ্গলবার বিকেলে আমি জ্বরাক্রান্ত হয়ে ঘোরের মধ্যে কোনক্রমে ছেলেকে বগলদাবা করে বাড়ী ফিরলাম ও শয্যা নিলাম। অর্থাৎ, কয়েক ঘণ্টার জন্যে মাত্র। এরপরে দু’দিন গরম গরম সুপ কিম্বা টেংরির জুস খেতে খেতে গল্পের বই পড়ব যে, অত সুখ কপালে নেইকো। ছুটি ফুটি নাই। যে করেই হোক চাঙ্গা হয়ে পরদিন যেতেই হবে। গেলাম। এবার সারাদিনের পর গলা গেলো ভেঙে। ফ্যাঁস-ফ্যাঁস করে অবিকল আমাদের পাড়ার গলায় নীল ঘণ্টি বাঁধা হুলোর মতন আওয়াজ সম্বল করে বাড়ীতে প্রত্যাবর্তন। এইবারে রান্না করতে গিয়ে আমার চোখ ফেটে জল আসতে চাইলো ও এক ছুটে মার কাছে গিয়ে সকলের গুষ্টি উদ্ধার করতে করতে অন্তত রেডিমেড এক কাপ গরম আদা-চা খেতে ইচ্ছে করতে লাগলো। ইতিমধ্যে ছেলে নানা রকম প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ শুরু করেছে, গলার অবস্থা দেখে মুখ লুকিয়ে দু’বার হেসেছে (কী বলবো আর, রাগ করতেও ভুলে গেছি ততক্ষণে)। ভাইরাস পুঙ্গব যাতে তেনাকেও না ধরে তাই নিজেকে নিজে একঘরে করলাম। আর টিপুকে বল্লাম, যাও তো সোনা, দশ পাতা অঙ্ক করে নিয়ে এসো, আমি চেক করবো। সুযোগ বুঝে সাড়া বাড়ী দখল করে ছেলে তো কার-রেসিং, গারজিয়ান্স অফ দা গ্যালাক্সি, স্টার ওয়ার্স, আরও নানা বিদঘুটে খেলায় তুমুল হুটোপাটি শুরু করে দিলো।
কাঁহাতক সহ্য করা যায় !! আমি ফোন নিয়ে মাকে ডায়াল করলাম। অনেকক্ষণ রিং হয়ে গেলো, কেউ আর ধরেই না। এবার বাবাকে করলাম। যদিও বাবা কানের গোড়ায় ফোন বাজলেও মোটেই শুনতে পায়না। অনেকানেক বার ফোন করতে থাকলে তখন বাধ্য হয়ে ফোন ধরে বলে, আরে তুই ফোন করেছিলি নাকি !! আমি তো শুনতেই পাইনি!! আমার দৃঢ় ধারণা, আমাকে কাটিয়ে দেবার জন্যেই বাবা এইসব বলে থাকে কারণ বেশীরভাগ সময়ে আমি যখন কল করি তখন বাবা হয় দাদাগিরি নয়ত সারেগামাপা নয়তো জি বাংলার অখাদ্য সিরিয়ালগুলো সব গোগ্রাসে গেলে। কী বলবো আর। যথারীতি ফোন কেউ ধরল না। আমার দ্বিগুণ জোরে কান্না পেলো। এবার কী করবো, এই ছাতার দুঃখের পাহাড় ঠেলে বিছানা থেকেই নামতে ইচ্ছে করছে না যে। উপায় না দেখে বোনকে হোয়াটসঅ্যাপে ডাকাডাকি করলাম। সে বিরক্ত হয়ে জানালো বাবা-মা, জেঠু- জেঠিমা এবং আরও অনেকে দল বেঁধে ভুটান বেড়াতে গেছে, রবিবার ফিরবে, আর আমি তো এসব জানি, অযথা ঘ্যানঘ্যান করার কি মানে!!
তক্ষুনি আমার মনে পড়লো, তাই তো, ওদের তো থিম্পু ফুন্তশলিং, আরও কোথায় কোথায় সব যাওয়ার কথা!! এদিকে বোনের ও তার ছেলেরও খুবই শরীর খারাপ, তারাও ভুগছে। তবে কিনা সে আমার থেকে অনেক বেশী রাশভারী মানুষ, অল্পেতে টসকায় না। অর্থাৎ এই দাঁড়ালো যে চারজনেই আমরা (আমি, টিপু, বোন এবং পিংপং) ওষুধের ভরসায় কোনওরকমে টিমটিম করে টিকে আছি আর ইদিকে ওনারা সব ভুটান পাহাড়ে মনের সুখে বেড়িয়ে বেড়াচ্ছেন!!! আমাদের একেবারে ভুলেই মেরে দিয়েছেন। ফোন অব্দি বন্ধ করেছে, কীরকম হৃদয়হীন ভাবা যায় !!
যাই হোক, বোন আমার অবস্থা দেখে দয়া করে ওদের ভুটানের ফোন নম্বরগুলো দিয়ে বলল খুব দরকার হলে ওতে ফোন করতে। আমি পত্রপাঠ ওই নম্বরে ফোন করতে শুরু করলাম। বারংবার ফোন করে আবার অসফল হয়ে রণে ভঙ্গ দিয়ে, গারগল করে, জ্বরের ওষুধ খেয়ে সকলের মুন্ডুপাত করতে করতে আবার আরেক কাশি-অধ্যুষিত নিদ্রাহীন রাত্রিযাপনে উদ্যোগী হলাম।
শুক্রবার আগত, কিছুতেই কিছু হল না দেখে ভোরবেলা কাজে যাওয়ার আগে ডাক্তার দেখাতে গেলাম (আজ্ঞে, একলাই, অত কপাল করে আসিনি। শেষ কবে আমাকে কেউ ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেছে মনে পড়েনা)। ডাক্তার অবস্থা দেখে আঁতকে উঠে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে দিলেন। আমাদের বসন্তোৎসবের জন্যে সেই কবে থেকে কতো উৎসাহ নিয়ে গান-টান প্র্যাকটিস করলাম, সেসব আর হবে বলে মনে হছে না। যাই হোক, শনিবার মেলা চেষ্টাতেও গলা দিয়ে গানের গ ও বের করতে পারলাম না।
এসে গেলো রবিবার, আমি তক্কে তক্কে ছিলাম। ফোন করতে শুরু করলাম আবার। এবারেও কেউ ধরেনা। কী ভেবেছেটা কী এরা !!! এবার একটু একটু চিন্তাও হল। রবিবার গেলো।
যাই হোক, এই সপ্তাহ আমার বসন্তকালীন ছুটি। আজ সকালে সবাই বেরিয়ে যাওয়া মাত্রই ফোন করলাম। এবারে বাবা ধরল!!! তারপরেই সে কতো গল্প, কীরকম দারুণ বেড়ানো হয়েছে, কেমন চমৎকার খাওয়া দাওয়া, কী অসাধারণ সুন্দর জায়গা, এইসব বিবরণ আর থামতেই চায়না। আমি যে কেমন আছি, আমার গলাটা যে ফ্যাঁসফ্যাঁসে শোনাচ্ছে, সেই নিয়ে কোন ভ্রূক্ষেপই নেই যেন !!! গল্পের তোড়ে হঠাৎ তেনার খেয়াল হল আমি অনেকক্ষণ চুপচাপ। তখন দয়া করে জিজ্ঞেস করলেন হ্যাঁ, তা তোরা কেমন আছিস বল !! আমি সঙ্গে সঙ্গে ক্ষোভে ফেটে পড়ে এই হপ্তার সমস্ত খতিয়ান পেশ করলাম, আর এই ব্যাবহারে যে আমি কিরকম মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছি তাও ঠারেঠোরে জানালাম। কী বলবো, কথার মাঝে যেন একটু খুকখুক হাসি অথবা কাশি শুনলাম, এমনকি একবার কুলকুচির আওয়াজও শুনলাম !! আমার ওপর দিয়ে যে কি সাঙ্ঘাতিক বিপদ যাচ্ছে, তার উত্তর কেবল, ‘এহহে, আবার ঠাণ্ডা লাগিয়েছিস, সকালে মাঙ্কি ক্যাপ পরে গেলেও তো পারিস!! কে হাসল তাতে নজর দেওয়ার দরকার নেই, নিজের সেফটি নিজের হাতে’। এই বলে মাকে ফোন দিয়ে কেটে পড়লো !!!
মা বরং একটু সুর নরম করে কী কী হয়েছে যত্ন করে জানতে চাইল, এমনকি তারপর একটু আহা-উহুও করলো। আমি ব্যাস্ত হয়ে গান বাজনার কথাটা বলতে যাচ্ছিলাম এমন সময় হঠাৎ মনে পড়ে গেছে এমন করে বলল, ওই যাহ গ্যাসে ডাল চাপানো আছে, তুই নিজের খেয়াল রাখিস আর গারগল করতে ভুলিস না কেমন, এখন রাখি তবে? বলে ফোন রেখে দিলো !!!!!!!
এই বুড়োবুড়ি গুলো কী পরিমাণ উচ্ছন্নে গেছে সে চোখে দেখা যায়না সত্যি !!! কী বলবো আর, জীবনে ঘেন্না ধরে গেলো !!! রাগে দুঃখে চারটে কাজু বরফি আর একটা ডালিম খেয়ে ফেলেছি। এখন আবার অতটা খারাপও লাগছে না। দেখি কালকে ফোন করে ভুটানের ফটোগুলো পাঠাতে বলবো :/

বাহুবলীর বলি

 

 

হ্যাঁ, তা বলছিলাম প্রতি শুক্কুর-শনিবার করে আমরা দু চারটে ছায়াছবি দেখার চেষ্টা করে থাকি। হ্যাঁ, বাড়ীতেই। জেবনে এখন সময়ের বড় অভাব, তাই খুব বাছাই করা কিছু সিনেমা পত্তর দেখা হয়, বেশীরভাগই বাংলা বা বড়জোর ইংরেজি। হিন্দি বাণিজ্যিক ছবি অনেক বছর হল দেখা ছেড়ে দিয়েছি, কারণ ওই দু ঘণ্টায় জমে থাকা বইগুলো পড়লেও কাজ দেয়।

তা এই সপ্তাহে বাড়ীতে প্রণয় এসেছে, সে আবার হিন্দি সব ছায়াছবি ফার্স্ট ডে, ফার্স্ট শো দেখে থাকে। ছায়াছবি বিশেষজ্ঞ আর কি। তারই প্ররোচনায় শুক্রবার গভীর রাতে আমরা বসলাম বাহুবলী দেখতে। সে বারবার হলফ করে বলল সময় নষ্ট হবেনা মোটেই, এ জিনিস না দেখলে জীবন বৃথা। অমর চিত্রকথা বরাবরই আমার বেশ প্রিয়, বসে পড়লাম সবাই।

ঘর অন্ধকার করে লেপ-টেপ মুড়ি দিয়ে বেশ আয়েস করে বসা গেলো। শুরুতেই দারুণ দারুণ সব সিন সিনারি দেখা গেলো। বিশালকায় উঁচু জলপ্রপাতের ওপার থেকে অসামান্যা সুন্দরী এক রানি টাইপের তেজী মহিলার পিঠে গেঁথে থাকা তীর নিয়েও সাদা লুঙ্গি পড়া, একজন ছোট্ট ও ন্যাড়া বাচ্চাকে কোলে করে একবুক ভয়ানক স্রোতস্বিনী জল ঠেলে সে কি সদর্পে বিচরণ। দেখে তাক লেগে গেলো। এই না হলে মা। পরে শুনলাম সে নাকি ঠাকুমা !! কিছুক্ষণ পরেই তার নাক অব্দি জলে ডুবে গেলো, তবু একটিমাত্র হাতে বাচ্চাকে মাথার ওপর তুলে ধরে সে ওই স্রোতের মধ্যে সটান খাড়া দাঁড়িয়ে থাকলো। দাঁড়িয়েই থাকলো যতক্ষণ না বাচ্চার চিল চিৎকার শুনে আশপাশ থেকে জেলে শ্রেণীর কিছু মানুষ দৌড়ে এসে তাকে উদ্ধার করে। তাকে মানে বাচ্চাকে, রানিমার হাত ছাড়া তো কিছু আর দেখা যাচ্ছিল না। সেই হাত এতক্ষণে হাঁপ ছেড়ে নিশ্চিন্তে সলিলসমাধি বরণ করেন। মৃত্যুর আগে যদিও অঙ্গুলি নির্দেশে সেই সুউচ্চ এভারেস্টতুল্য জলপ্রপাতের ওপারে দেখিয়ে দেন। জেলেদের মধ্যে যে সবথেকে মুখরা ও বড়লোক  মহিলা, সে বাচ্চাকে কব্জা করে সকলকে ধমক দিয়ে প্রপাতের ওপারে যাওয়ার শর্টকাট গুহাপথ পাথর দিয়ে চিরতরে বন্ধ করে দেয়। বড়লোক বুঝলাম কি করে – তার হাতে – পায়ে – কানে ও গলায় ভারী ভারী চমৎকার কাজ করা রুপোর সব গয়নাগাটি ছিল, এর এক সেট পেলে বে এরিয়াতে দুর্গা পুজোয় সাড়া পড়ে যেতো।

এরপর আর কি, সেই বাচ্চার নাম দেওয়া হয় শিবু এবং সে নিজের জন্মসূত্রের অমোঘ টানে, বড় হওয়ার বিভিন্ন ধাপে প্রায় রোজ একবার করে খাড়াই পাথরের দেওয়াল ডিঙ্গিয়ে জলপ্রপাতের ওপারে যাওয়ার চেষ্টা চালাতে থাকে। খালি হাতে পিচ্ছিল পাহাড় গাত্রে তার ডিগবাজি দেখে বারংবার পিলে চমকে উঠতে থাকে দর্শকের এবং তার মায়ের। সুতরাং তার মা এবারে তাকে আটকানোর জন্যে এক আরবিট সাধুকে ধরে এনে শিবের পুজো/ যজ্ঞ করতে থাকে। শিবকে সন্তুষ্ট করতে মা ঘড়া ঘড়া জল তার মাথায় ঢালে, সাধু জানায় আরও কয়েকশ ঘড়া ঢালতে হবে। শিবু মায়ের কষ্ট দেখে খচে ফায়ার হয়ে সাধুকে যা নয় তাই বলে নিজেই জল আনতে উদ্যত হয়। সাধু নির্লিপ্ত মুখে জানায় ওতে ফল হবেনি, যার পুজো তারেই জল বয়ে আনতে হবে। এবার রেগে আগুন হয়ে শিবু কোথা থেকে শাবল জোগাড় করে শাবলের তিন ঘায়ে সেই মস্ত বড় (এ সিনেমায় কিছুই ছোট নয়, সবই বিশালাকার) শিবলিঙ্গকে স্থানচ্যুত করে অবলীলায় ঘাড়ে ফেলে ইয়েতিসম ইয়া ইয়া পদক্ষেপে গিয়ে শিবকে একেবারে প্রপাতের তলাতেই বসিয়ে দিয়ে আসে, নে, কতো স্নান করবি কর !! এই কাঁধে শিব নিয়ে শিবুর ছবি অনেক জায়গায় দেখেছি মনে পড়লো। শ্রদ্ধায়, ভক্তিকে আমি ততক্ষণে আধমরা।

যাই হোক, এ হেন শিবুকে আটকাবে এমন পাহাড় এখনো তৈরি হয়নি, অতএব এক সুন্দর স্বর্নালী সন্ধ্যায় কুহকিনী মায়ার পিছু পিছু শিবু প্রায় খেলতে খেলতেই সে এভারেস্ট তুল্য পাহাড়- প্রপাত ডিঙ্গিয়ে ওপারে ক্যানাডায় উপস্থিত হয়। ক্যানাডা মনে হল কারণ চারদিকে বেশ বরফ ও মেলা অনুপ্রবেশকারী।  সেখানেই কাহিনীর পটভূমিকা অর্থাৎ মাহিশ্মতী সাম্রাজ্য। সেখানে অবশ্য এক কুচি বরফও নেই!

সেখানে এক দুষ্টু রাজা ও তার বাপ এক ভালো রানিকে শিকলে বেঁধে যাচ্ছেতাই অপমান করে চলেছে পঁচিশ বছর ধরে। সেই রানিই হলেন আমাদের শিবুর আসল মা। শিবুকে এই রানিকে সেখান থেকে উদ্ধার করতে হবে। এই গুরুদায়িত্ব ভুলে শিবু বেমক্কা এক ডানপিটে লড়াই খ্যাপা মেয়ের পেছনে প্রচুর ফুটেজ ব্যয় করতে থাকে।

একে অন্যকে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে মারে, খুনোখুনি লাগে আর কি। আমি টিপুকে একটু বাজিয়ে দেখার জন্যে বল্লাম এইবার ওরা একে অন্যকে মেরে ফেলবে কী বল? সে বলল, না না দে আর ইন লাভ !! কী বলবো আর !! বেশী ঘাঁটালাম না!!

প্রণয় বলেছিল খুবই পারিবারিক সিনেমা, সবাই একসাথে বসে দেখা যায়, অথচ এইখানে দেখা গেলো সেই মেয়ের পেছনে ধাওয়া করতে করতে শিবু তার তাবু সদৃশ বিরাট ঘাঘরা খুলে আবার উলটো করে পরাচ্ছে, কারণ উলটো দিকটা লাল রং। রিভারসিব্ল ড্রেস যাকে বলে !! লাল রং পরে, মুখচোখ ধুয়ে সেই মেয়ে বেশ ‘নারীসুলভ’ ন্যাকামো করতে থাকে।

এবার আসা যাক মাহিশ্মতীর কথায়। সেখানে দেখা যায় দুষ্টু রাজা যার নাম বল্লালদেব, তার পেটাই করা বিরাট চেহারা। সে খেলাচ্ছলে ততোধিক বিরাট মুহুর্মুহু গর্জনকারী ষণ্ডকে সম্মুখ সমরে একেবারে পেড়ে ফেলে। এঁর সঙ্গেই লড়তে হবে আমাদের শিবুকে। কি অন্যায় !!

সেই রাজ্যের ভীষ্ম পিতামহ যার নাম কাটাপ্পা সে বুড়ো হয়েছে তবে এখনো তলোয়ারের এক কোপে অন্য তলোয়ারকে লম্বালম্বি চিরে দিতে পারে!!

আর বল্লালদেবের আছে এক রিট্র্যাক্টেব্ল গদা। সে এক সাঙ্ঘাতিক জিনিস। এর মধ্যেই রাজ্যের লোকজন শিবুকে দেখতে পেয়ে ‘বাহুবলী, বাহুবলী’ বলে মহা শোরগোল করে। জানা যায় বন্দিনী রানির বর যে রাজা সে বল্লভদেবের ভাই বাহুবলী, শিবু যেহেতু তার ছেলে, তাই তাকে হুবহু বাপের মতন দেখতে !!

এবারে কাটাপ্পা উবাচ ফ্ল্যাশব্যাকে দেখা যায় মাহিশ্মতী রাজ্যের থিঙ্কট্যাঙ্ক হলেন শিবগামী নামের এক দোর্দণ্ডপ্রতাপ মহিলা, শিবু- বাহুবলীর সেই ঠাকুমা। তার কথাতেই গোটা রাজ্য ওঠে বসে। খুবই বিচক্ষণ ও তেজী এই মহিলার নিজের ছেলে বল্লালদেব আর ভাসুরের ছেলে বাহুবলী। দুজনকেই মানুষ করেন ইনি।

অতীতে মাহিশ্মতী রাজ্যের ওপর কালকেয় নামের এক ক্রুর রাজার দৃষ্টি পড়ে। তাঁকে ও তার দলবলকে মহাসাঙ্ঘাতিক টাইপ দেখতে। নামের সঙ্গে মেলানো তাঁদের গায়ের রং (কালো মাত্রেই বজ্জাৎ এটা শুধু পশ্চিমীরা মনে করে না, ভারতীয়দের মতন রেসিস্ট জগতে কম আছে), চুলে জট, উকুনও থাকা বিচিত্র নয়, গলায় মুণ্ডমালা, আর সকলের গুটখাখোরদের মতন বিচ্ছিরি কালো ছোপ পড়া দাঁত !! বোঝা যায়, তারা এলিট শ্রেণীভুক্ত নয়!! তারা অদ্ভুত ভাষায় টাগড়ায় শব্দ করে কথা বলে, যা বলে সেসব শুনলে গা পিত্তি জ্বলে যায়। সুতরাং যুদ্ধ লাগে!!

এদিকে টিপু ততটাই হিন্দি জানে যতটা আমি হিব্রু জানি, তাই এতক্ষণ ভাসা ভাসা বুঝলেও এইখানে হঠাৎ টিপু ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে যুদ্ধের খুঁটিনাটি মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। সে কী হাড় হিম করা যুদ্ধ রে ভাই!! কতরকম কায়দার অস্ত্র, আর কৌশল। কালকেয়রা ক্যাল খেলে টিপুর খিলখিল হাসি আর বাহুবলী বেকায়দায় পড়লে হুঙ্কার!! একবার বলল এইবার ওই নিনজারা শত্রুকে ব্লেড দিয়ে কেটে ফেলবে!! নিনজা অর্থাৎ মাহিশ্মতীর সৈন্যদল 😀 পনেরো মিনিট পয়সা উসুল যুদ্ধের পর যথারীতি বাহুবলী জয়ী হয়।

পুরস্কার স্বরূপ বাহুবলীকে রাজা বানিয়ে দেবার আদেশ দেন শিবগামী। সব ঠিকঠাক, এমন সময় দেশ বেড়াতে গিয়ে বাহুবলী প্রেমে পড়ে যায় দেবসেনা নামের এক বীরাঙ্গনার সাথে। সে দিনেরবেলা আরচারি প্র্যাকটিস করে আর রাতের বেলা কৃষ্ণকে ঘুমপাড়ানি গেয়ে শোনায়!! এই খবর পেয়ে, ‘তোমরা যাকে করছ বিয়ে, আমিও তাকে চাই’ নীতিতে বিশ্বাসী কুচুটে শিরোমণি বল্লালদেব কুট কচালি করে দেবসেনার সাথে নিজের বিয়ের প্রতিশ্রুতি আদায় করে শিবগামীর কাছে। ওদিকে আবার কুন্তলা-রাজ্যে প্রেমে হাবুডুবু মহাপরাক্রমী বাহুবলী নেহাতই ছ্যাবলা ও ক্যাবলা বোকা-বোকা ভাবমূর্তি বানিয়ে দর্শকের পিত্ত প্রদাহ করতে থাকে। শিবগামী দেবসেনার উদ্যেশ্যে ঝুড়ি ঝুড়ি গয়না ইত্যাদি প্রেরণ করে বল্লালের হয়ে তার পানিপ্রার্থনা করেন। দেবসেনা বিরাট অ্যাটি দেখিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করে দেয়! এদিকে বাহুবলী ও কাটাপ্পা খুকীকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যায় কারণ বাহুবলী ভাবছে শিবগামী দেবসেনার সঙ্গে তার বিয়ে দেবেন!!! এখানেই ক্যাচালের সূত্রপাত!! দেবসেনা আক্ষরিক অর্থেই বাহুবলীর স্কন্ধে চাপে ও মাহিশ্মতী এসে উপস্থত হয়।

এসে ভুল বুঝতে পেরে দেবসেনা ক্যাট ক্যাট করে সম্রাজ্ঞী শিবগামীকে দু’কথা শুনিয়ে দেয়। সে ও ছাড়বে কেন, বড় বড় চোখ করে সেও পাল্টা দেয়। অতঃপর বীরগাথা পরিবর্তিত হয়ে থোড়-বড়ি সাস-বহু অলিগলি চলতে থাকে। শিবগামী রেগে মেগে বাহুবলীর রাজা সাজা ক্যান্সেল করে বল্লালকে রাজা সাজিয়ে দেয়, বাহুবলীকে সেনাপতি!! সেও নিজেকে ষোড়শ লুই মনে করে প্রেমের জন্যে এক কথায় রাজা হবার লুক্রেটিভ কেরিয়ার বিসর্জন দেয়। এদিকে কিলো কিলো গয়নাগাঁটি প্রত্যাখ্যান করা দেবসেনা অন্তঃসত্ত্বা হতেই লোভাতুর হয়ে সন্তানের জন্যে সিংহাসন দাবী করে বসে। না পেয়ে ঝাল মেটাতে শ্বশুরবাড়ি ও শাশুড়ি সম্পর্কে কুকথা বলে ও শাশুড়ির বিপক্ষে বরকে লেলিয়ে দেবার চেষ্টা করে।

মাঝখান থেকে দুমুখো কেস খেয়ে বাহুবলী ছাপোষা, এলেবেলে তাপস পাল কি সুখেন দাস টাইপের ভাবভঙ্গি করে খুন হয়!!!

এবারে আবার একপ্রস্থ অতি নাটকীয়, অতিরঞ্জিত, অতি ধুন্ধুমার, অতি বিরক্তিকর যুদ্ধের পর দেবসেনা উদ্ধার হয় ও তাহারা সুখে শান্তিতে কালাতিপাত করতে থাকে!!!

এর মধ্যে থেকে উপরি পাওনা বল্লালদেব। উরেঃ কি চেহারা !! পিঠের দিকে মেরুদণ্ডর দুপাশে নাম-জানি-না মাংসপেশিকে গুল্লি গুল্লি করে নাচাতে পারে লোকটা !!! ভাবা যায় !!! আর দেখতেও মারকাটারি। তবে সিনেমার আসল হিরো হলেন শিবগামী, কি চোখ, কি দাপট আর কি ব্যাক্তিত্ব!!

আর একটা কথা, বাহুবলী২ তে, শিবু ওরফে বাহুবলীর ঝাঁকড়া চুল কিছুটা পাতলা হয়েছে মনে হল, জলপ্রপাতের জলে চান করে করে নিশ্চয়ই!! সেই জলের তলায় বসিয়ে রাখা শিবের কি দুর্গতি হবে ভাবতেই আমার কেমন দুঃখ দুঃখ হচ্ছে, সত্যি বলছি 😀

1200x630bb

বাবা হওয়া কি মুখের কথা?

ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার পরিচয় কবে থেকে তা আমার সঙ্গত কারণেই মনে নেই| তবে বন্ধুত্বের শুরু সেই তখন থেকে যখন পানাগড়ে থাকতে ভোর পাঁচটায় উঠে তিনি রোজ পাড়ার চায়ের দোকানে প্রাতঃকালীন প্রথম চা-পান করতে যেতেন আর আমাকে সাথে নিয়ে যেতেন| আমি যেতাম তেনার কোলে চেপে, তাঁর শার্টের দ্বিতীয় বোতামটা মুখে পুরে চিবোতে চিবোতে| সেই শুরু, তারপর থেকে আজ অব্দি জীবনের সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী প্রথমে এনাকে না শোনাতে পারলে বিরিয়ানিও হজম হতে চায়না আমার| আরেকটু বড় হতে একরকম হাতে ধরে বাংলা পড়তে শিখিয়েছেন ইনি আমাদের|স্কুলে বাংলার পাট ছিল না| ছুটির দুপুরে ভরপেট মাংস-ভাতের পর ভাতঘুমের লোভে আমরা গিয়ে উঠতাম বিছানায়| এক বালিশে ঠাসাঠাসি করে দুপাশে আমি আর বোন, মধ্যিখানে উনি| এরপর সুকুমার সমগ্র থেকে একের পর এক ছড়া আবৃত্তি করে যেতেন|বোম্বাগড়ের রাজা, ট্যাঁশগরু, হুঁকোমুখো হ্যাংলা, শব্দকল্পদ্রুম| পড়তে না পারলেও ছবিগুলো দেখতাম অবাক হয়ে| শুনতে শুনতে দুচোখের পাতা ভারী হয়ে আসতো আর কখন যেন পৌঁছে যেতাম এক অলীক অনন্য জগতে| দুইখানা ল্যাজ দুলিয়ে অদ্ভুত কান ওয়ালা এক প্রাণী যেখানে মাছি তাড়াতে হিমশিম খাচ্ছে, কিম্বা হারুদের অফিসে খুব স্টাইল করা ঢুলুঢুলু চোখ একজন কিম্ভুত কায়দায় বসে আছে| তারপর শিবরাম, পাগলা দাশু, ঠাকুরমার ঝুলি| ‘বিদ্রোহী’র এমন দুর্দান্ত আবৃত্তি আর কেউ করতে পারে বলে আমার জানা নেই| বাংলা পড়তে শিখে গেলাম আর শেয়ালকে ভাঙা বেড়া দেখালে যা হয়, তাই হল| আমরণের বন্ধুকে খুঁজে পেয়ে গেলাম – বই|

আমার জীবনের একমাত্র সুপারহিরো হলেন ইনি| ছোটখাটো সাধারণ জিনিসের ওপর খানিকক্ষণের মধ্যে অসামান্য কারিগরি ফলিয়ে তার ভোল পাল্টে ফেলেন| স্কুলে যখন নার্সারিতে পড়ি, যাকে এখন বলে প্রি-স্কুল, তখন একবার দিদিমণি বলে দিলেন বাড়ী থেকে একটা ডিমের খোলা নিয়ে আসতে হবে, পুতুলের মুণ্ডু বানানো হবে| আমি গিয়ে বল্লাম বাড়ীতে|ইনি করলেন কি একটা ডিমের বিপরীত দুই দিকে ছুঁচ দিয়ে দুটো ফুটো করলেন| তারপর একটার ভেতর ফুঁ দিয়ে দিয়ে অন্যটা দিয়ে ডিমের ভেতরের মালকড়ি সব বের করে ফেললেন| তারপর একই কায়দায় জল দিয়ে ডিমের ভেতরটা ধুয়ে ফেলা হল| শেষে যা দাঁড়ালো তা হল একটা পুরো আস্ত ডিমের ফাঁকা খোল ! তা নিয়ে উত্তেজনায় ফুটতে ফুটতে  স্কুলে গেলাম আমি| দিদিমণিরা একে অন্যকে ডেকে ডেকে দেখালেন সেই জিনিস| দুঃখের বিষয় স্কুলগুলোতে এখনকার মতন তখনও নবীন চিন্তাভাবনার জায়গা ছিলোনা| গতে বাঁধার বাইরে গেলেই ঠুকে-পিটে আবার ছাঁচে ফেলা হতো| তাই ডিম নিয়ে খানিক ‘ওমা’ ‘আরি শাবাশ’ করার পরে দিদিমণি ডিমের একদিকে যথাবিধি খুঁচিয়ে ধ্যাবড়া খোঁদল করলেন ও সেখানে কাঠি গুঁজে পুতুলের মুণ্ডু ও ধড় বানিয়ে ফেললেন| খুবই হতাশ হয়েছিলাম|

আমি অতি বদ বাচ্চা ছিলাম বলে মায়ের সঙ্গে খিটিমিটি লেগেই থাকত| এইসব সময়ের  উদ্ধারকর্তা ছিলেন ইনি| একবার কেন যেন মা’র সাথে রাগারাগি করেছি,দুপুরে অনশন ধর্মঘট করেছি| সকলে বলে বলে ক্লান্ত| মাও দূরছাই বলে বোনকে খাইয়ে নিজে খেয়ে-দেয়ে গল্পের বই হাতে প্রস্থান করেছে| আমি বসে আছি জানলার ধারে, ঠা ঠা পিচগলা দুপুরে বাইরে কেউ কোথাও নেই| থমথম করছে যেন চারদিক, গাছের পাতাগুলো অব্দি গম্ভীর ভাবে চুপ| এমন সময়ে একটা কাক কর্কশ ‘কা কা কা’ আওয়াজ করে উড়ে গেলো| বাবা অমনি এসে বলল, ‘ওই দ্যাখ, কাকটা অব্দি তোকে বলছে খা, খা খা’|ব্যাস, কেমন ফিক করে হাসি পেয়ে গেলো| ‘আরেকবার সাধিলেই খাইব’ কে সত্যি প্রমাণ করে গুটিগুটি টেবিলে গিয়ে বসলাম| মা ঘর থেকে খ্যাচখ্যাচ করে বলল, ওর জন্যে আলাদা করে মিষ্টি দই তোলা আছে, বলে দাও|

যেকোনো সুপারহিরোর মতই এনার অসীম সহ্যশক্তি|

একদিন বিকেলে মা আমার হাতে চায়ের কাপ-প্লেট ধরিয়ে বলল বাবাকে দিয়ে আসতে| আমি আবার যেকোনো কাজের গুরুদায়িত্ব পেলে অত্যুৎসাহে অনেক সময় সেটা মাটি করে ফেলি| তাই চায়ের কাপ হাতে সারসের কায়দায় সন্তর্পণে যাচ্ছিলাম| প্রায় পৌঁছেও গেছিলাম| এদিকে, গরমকাল ছিল বলে ইনি মেঝেতে খালি গায়ে আধশোয়া হয়ে ছিলেন| আমি প্লেটটা নামানোর সময়ে কি করে চা একটু চলকে গেলো আর তাই সামাল দিতে গিয়ে প্লেটটা হাত ফসকে হঠাৎ পড়ে গেলো| ব্যাস, আগুন গরম চা সমস্তটাই পড়লো গিয়ে খোলা গায়ের ওপর| মা তো রান্নাঘর থেকে হাঁউমাঁউ করে তেড়ে এলো| আজ এই সিন থেকে বেঁচে কিছুতেই বেরোতে পারব না অনুমান করে, আমি ভয়ে শিঁটিয়ে দাঁড়িয়ে আছি| মা উত্তম মধ্যম শুরু করা আগেই হাঁ হাঁ করে থামিয়ে উনি হাসিমুখে বললেন, আরে কিচ্ছু হয়নি আমার| একটু জল দিলেই হবে| তুই যা তো ন্যাতা নিয়ে আয় বলে অকুস্থল থেকে আমাকে সরিয়ে দিয়ে নিজে গেলেন জল দিতে| এমন সুবর্ণ সুযোগ আর শিকার হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় মা উপায়ান্তর না দেখে গজগজ করতে করতে পুনরায় রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকল|

এটা ওনার সহ্যশক্তির খুব সামান্য উদাহরণ| অসাধারণ শারীরিক যন্ত্রণা টুঁ শব্দ না করে একেবারে মুখ বুজে সইতে দেখেছি বহুবার|

আক্ষরিক অর্থেই জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সব করে থাকেন| বেশীরভাগ বাবাদের যেমন থাকে, এনারও একটা ‘টুল বক্স’ আছে| তাঁর মধ্যে থেকে অত্যাশ্চর্য সব হাতিয়ার বেরিয়ে তাক লাগানো সব মেরামতি সেরে আবার বক্সে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ে| আমাদের স্কুলের চামড়ার কালো ব্যালেরিনা জুতো ছিঁড়ে গেলে গুনছুঁচ দিয়ে ঠিক মুচিদের মতন করে ফোঁড় তুলে মেরামত করেছেন অনেকবার| পেঁপের ডাঁটির মধ্যে গলানো মোম ভরে নতুন মোমবাতি তৈরি করে দিতেন| আসামের তুমুল শিলাবৃষ্টির পর বাইরে বেরিয়ে একটা গেলাসের ভেতর সুতলি ধরে রেখে মারবেল সাইজের সেইসব শিলা দিয়ে ঠেসে ভরে সুতলি টেনে বের করলেই শিলার গেলাস তৈরি, একবার বানাতেই পাড়ার সব বাচ্চা পালে পালে বাড়ী থেকে গেলাস নিয়ে আসতে লাগলো, শিলাগুলো যতক্ষণ না গলে যায়, এই খেলা চলল তাঁকে ঘিরে| নিজেই ঘুড়ি বানিয়ে প্যাঁচ খেলা, পেয়ারা গাছের ডালে দোলনা বেঁধে দেওয়া, মায় বাড়ীতে জ্যান্ত মুরগী এলে পেছনের বারান্দায় নিজে হাতে কেটে পরিষ্কার করে তারপর রান্না, সবেতেই পারদর্শী| শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা নির্বিশেষে ভোর চারটেয় উঠে পড়েন| অনেকদিন অব্দি ভোরের কাঁচা ঘুম ভেঙে তাঁর উদাত্ত গলার চণ্ডীপাঠ শুনতে শুনতে আবার ঘুমিয়ে পড়েছি|

আমার সংসারে একমাত্র অতিথি যে দুধের খালি ক্যান, জ্যামের শিশি, বিস্কুটের কৌটো সব ধুয়ে মুছে জমিয়ে রাখে পরে কাজে লাগতে পারে ভেবে, ছেঁড়া গার্ডার গিঁট দিয়ে আবার ব্যাবহার করে, আমার জন্মেরও আগেকার এঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং বাক্সর সব টুলস যত্ন করে এখনো ব্যবহারোপযোগী করে রাখে| বাগানে কাঠবিড়ালি গর্ত খুঁড়ে তছনছ করছে, কোনও ওষুধেই কাজ হচ্ছেনা, শুধু ফোনে এই গল্প শুনে গর্তগুলোর মধ্যে গোলাপ গাছ কাঁটা শুদ্ধু ভরে রাখার নিদান দিয়ে কাঠবিড়ালিকে চিরতরে অর্ধচন্দ্র দিতে পারে যে, সে আর কেউ না, আমার বাবা|

জীবনের সবখানে হেরে এলেও জানি এনার কাছে আমিই সেরা|

আজ তোমার দিন, বাকী সব দিনগুলো হয়তো আমাদের কারণ জানি তুমি আছো, তাই|

একদিন প্রতিদিন

কুহু-কুহু কুহু-কুহু … কুহু-কুহু কুহু-কুহু
আহা, এইতো বসন্ত এসে গেছে| হাল্কা মিষ্টি ঠাণ্ডা, লেপটা গায়ে জড়িয়ে আরও একটু ঘুমনোর চেষ্টা চালাই|
কুহু-কুহু কুহু-কুহু … কুহু-কুহু কুহু-কুহু ঊ ঊ ঊ ঊ …
আরে কি জ্বালা, সবে প্লাস্টিক চাটনি পড়েছে পাতে, সাবড়ে এনেছি প্রায়| এখনও দই, রসগোল্লা বাকী, কোকিলটা এমন করে কেন !
এরপর বিকট কুহুঊঊঊঊঊর ধাক্কায় ধরাধামে ধড়াম করে পড়তে বাধ্য হই| অ্যালার্ম বাজছে !! বাইরে অন্ধকার, সকাল ছ’টা বাইশ বাজে !! দূরছাই, এইতো পাঁচ মিনিট হল ঘুমিয়েছি, এর মধ্যেই সকাল? মর্‌গে যা, আজ আর উঠবোই না| যাক সব রসাতলে| লাইফ হেল হয়ে গেলো দেখছি| কাউকে দাসখত দিয়ে রেখেছি নাকি, উঠবোই না আজকে, দেখি কি হয়|
পাঁচ মিনিট আরও ঘুমিয়েছি কি ঘুমাইনি প্রথমে বাথরুমে কলকল করে জলের আওয়াজ, তারপর পিঁ পিঁ পিক করে দরজার অ্যালার্ম বন্ধ করা হল, তারপরে শুরু হল রান্নাঘরে খুটখাট, ছড়ছড় করে কল খোলার আওয়াজ, কাপ-সসপ্যানের যুগলবাদ্য… এইসব কাঠের বাড়ী কেন যে বানায়| এদিকে বাইরের কোনও আওয়াজ ঢুকবে না, সারাক্ষণ মনে হবে যেন একটা বাব্লের মধ্যে বাস করছি| অখণ্ড নিস্তব্ধতা দিনমান| অথচ বাড়ীর মধ্যে সামান্যতম আওয়াজও এমন অ্যামপ্লিফাই হয়ে কানে লাগে যে চমকে চমকে উঠতে হয়|
আর মটকা মেরে থাকা চলেনা| চোখ ডলতে ডলতে পা ঘষটে বাথরুমে হাজির হই| দিন শুরু হয়ে গেলো|
সেখান থেকে বেরিয়ে প্রথম কাজ খুদে কুম্ভকর্ণকে টেনে তোলা| প্রতিদিন কিছু না কিছু কায়দাকানুন করতে হয়| যেমন আরে ওঠ ওঠ, স্কুল যাবি না? আজকে সেই টেডি বেয়ার পিকনিক আছে যে রে? (স্কুলগুলো পড়াশোনায় অষ্টরম্ভা হলে হবে কি, দেখনবাহার কীর্তিকলাপ খুব, ভাগ্যিস) বলতেই কাজ হয়, তড়াক করে উঠে পড়ে|
এসব কিছু না থাকলে অবশ্য ব্যাপারটা শেষে প্রায় শিশু নির্যাতন পর্যায়ে চলে যায়| আমি টেনে তুলে বসিয়ে দিই, সে আবার চালের বস্তার মতন আস্তে করে হেলে বিছানায় বডি ফেলে দেয়| ‘ওঠ রে, ওঠ রে’ করতে করতে ততক্ষণে আমার মেজাজের দফারফা, সকাল সক্কালই মাথা দপদপ করতে থাকে| মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় দিই কানের গোড়ায় এক, তেনার ঘুমও কাটবে, আমার মেজাজও ঠাণ্ডা হবে|
যাই হোক, শেষকালে মাতৃগঞ্জনাতে আর তিষ্ঠোতে না পেরে মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে জয় করে তিনি উঠে বসতে সক্ষম হন| সাতটা বেজে গেছে| এরপর তাকে ঠেলতে ঠেলতে বাথরুমে, সেখান থেকে একরকম কোলে তুলে কিচেনে, কারণ তখনও তিনি যেন ঘোরের মধ্যে স্বপ্নজাগরণে বিচরণ করছেন বলে মনে হয়|
এরপর ঝটিকা গতিতে সব হতে থাকে| একঢোঁক জল গিলে, প্রথমে ছেলের প্রাতঃরাশ তৈরি করে প্লেটে দিয়ে, এক কাপ দুধ গরম করে তাকে খেতে বসার ফার্স্ট ওয়ার্নিং দেওয়া হয়| দিয়েই তার লাঞ্চ বানাতে বানাতে তার স্ন্যাক্স গোছানো| এই দশ মিনিটে তিনি আবার সোফাতে ঢলে পড়ে আর একপ্রস্থ ঘুম দেওয়ার চেষ্টা চালাতে থাকেন| আমাকে কাজ সারতে সারতে মুহুর্মুহু নানা রকম হুমকি/ ধমকি দিয়ে যেতে হয়| সব বৃথা করে সে গড়াগড়ি খেতে থাকে| কাজ শেষ করে তাকে টেনে তুলে খেতে বসানো হয়| ঝাড়া পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে ক্রমাগত আবোল তাবোল খেজুরে গপ্পো করে, কখনও বা ধমক দিয়েও পুরো খাওয়ানো যায়না|
‘নে নে চটপট কর, দেরী হয়ে যাচ্ছে তো’ … ‘আরে ভুলে গেছো, আজ তো স্কুল নেই, এই উইকে স্প্রিং ব্রেক’ !!! কেলো করেছে, এটা একদম মাথায় ছিলোনা !! মনে পড়ে গেলো, সকালে বাড়ীতেই থাকবেন, দুপুরবেলা এক বন্ধুর বাড়ী তেনাকে রেখে আমাকে কাজে যেতে হবে| রাতে ফেরার পথে আবার তাকে নিয়ে বাড়ী|
এদিকে সেই সপ্তাহেই তেনার বাবা থাকছেন না, জরুরী কাজে বাইরে!! আমারও বিস্তর কাজের চাপ|
আলিস্যি ঝেড়ে জয়মা বলে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় সংসার সমুদ্রে|
স্নান সেরেই তেনার খেলাধুলোর ধুম পড়ে যায়| সারা বাড়িময় হুটোপাটি, দৌরাত্ম্য চলে| প্রায়শই আমাকেও সঙ্গত করার জন্যে চাপাচাপি করতে থাকে|
সময় চলে যাচ্ছে| তাড়াহুড়ো করে একটু চোখ বুলিয়ে নিতে থাকি সেদিনকার ক্লাসগুলোর জন্যে – ক্লাস ওয়ান মেজর হিস্টোকম্প্যাটেবিলিটি কমপ্লেক্সের সঙ্গে সিডি ফোর কো-রিসেপ্টারের ইমিউনোগ্লোবিউলিন ডোমেইনের ইন্টের‍্যাকশান যদি ম্যাচ করে তাহলে হেল্পার টি সেলগুলো অ্যাক্টিভ হয়ে…
‘মাম্মা, দ্যাখোওওও, এইযে লাইটনিং ম্যাক কুইন ক্যামন করে ফ্লাই করতেও পারে, এইযে যাচ্ছি দ্যাখো, হুউউউশশ, এবার ক্যাপ্টেন আমেরিকা এসে তো ব্রুস ব্যানারকে হেল্প করবে, বুঝেছ… ব্রুস ব্যানার কে বলো তো?’
‘অ্যাঁ, ইয়ে, ইমিউনো…’
‘ধুর, সেদিনকেই তো শেখালাম, আবার ভুলে গেছো, তুমি আমার কথা মন দিয়ে শোনোনা কখনও…’ ব্যাপারটা গাল-ফোলা দুরারোগ্য অভিমানের দিকে এগোতে চায়|
‘না, না, শুনছি শুনছি, আরেকবার বলে দে..এবার ঠিক মনে রাখবো…’
তার দিকে তাকিয়ে থেকে ঘাড় নেড়ে বোদ্ধার মতন ভাব করি আর মনে মনে ঝালিয়ে নিতে থাকি – হ্যাঁ, তাহলে সিডি এইট ওয়ালা টি সেলগুলো অ্যান্টিজেন প্রেসেন্টিং সেলের কাছে…
‘এইবার হাল্ক উইল কিল থ্যানোস কারণ হাল্ক বেশী পাওয়ারফুল…ইয়াআআআ, বুম বুম বুম… দ্যাখো, দেখছ না ক্যানো হ্যাঁ?’
নাহ, অসম্ভব… ‘আচ্ছা সোনা, তুমি এখন এঘর থেকে যাও তো, গিয়ে একটু অ্যাংরি বার্ডস খেলো, একটু পরে খেতে ডাকবো|’
নাচতে নাচতে বিদায় হয়|
অন্য ঘর থেকে অ্যাংরি বার্ডসের চুঁইইই , ইক্লাআআ, খুসসসসস, ডাঁই ডাঁইডাঁইডাঁই …ধরনের বিজাতীয় সব আওয়াজ ভেসে আসতে থাকে| তার মধ্যেই আবার সচেষ্ট হই – এস পি থ্রি ডি টু , অক্টাহেড্রাল… সালফার হেক্সাফ্লুরাইড, আরেকটা যেন কি ছিল…. হ্যাঁ, মলিবডেনাম কার্বনিল… সাড়ে এগারোটা |
এক্ষুনি খেতে বসতে হবে| আবার সেই ঝাড়া পঁয়তাল্লিশ মিনিটের পাঁয়তাড়া| তারপর নিজের খাওয়ার পালা| নিজের জন্যে এক থালায় সব বেড়ে, এক চক্কর মাইক্রো করে তাকে জামা পরতে পাঠালাম| এই কাজটা সে নিজে নিজেই করতে ভালবাসে| আমার চোদ্দ দুগুণে আঠাশ পুরুষের পুণ্যফলে এটা সম্ভব হয়েছে, নচেৎ এই খাতেও নাহোক কিছু আধাঘণ্টা বরবাদ হতোই| তাঁকে বলি ‘আমি এখন লাঞ্চ করবো, আমাকে বিরক্ত করবে না কিন্তু, কিছু দরকার হলে পরে বলবে|’ বলে খেতে খেতে কয়েকটা খাতাপত্র দেখে ফেলার চেষ্টা করি|
ব্যাস, সময় শেষ, বেরোতে হবে|
দরজার গোড়ায় দেখি তিনি বিবিধ খেলনাবাটি, বই, রং পেন্সিল ইত্যাদি মিলিয়ে এক বোঁচকা মালপত্র নিয়েছেন| সেগুলোকে ব্যাগে ব্যাগে ভরে, খাবার জল, জলখাবার, রুমাল, আমার ব্যাগ, কম্পিউটার মিলিয়ে মালের বহর দেখে মনে হল যেন দুদিনের জন্যে কোথাও বাইরে যাচ্ছি বুঝি|
তিনি নিজে কেবল জুতোটি পরে একটা ট্রেন হাতে নিয়ে বললেন, আমি অ্যালার্ম দিয়ে দিচ্ছি, তুমি বাকী জিনিস নিয়ে চটপট চলে এসো মাম্মা !! ল্যাগব্যাগ করতে করতে সব জিনিস গাড়ীতে তুলে চললাম| বন্ধুর বাড়ীতে ওনাকে নামিয়েই ছুট দিতে হবে, হাতে একদম সময় নেই|
মাইল পাঁচেক আসার পর মনে পড়লো খাতা যে দেখেছি তালেগোলে সেগুলো আনতেই ভুলেছি !! শুনে তিনি বিচক্ষণের মতন বললেন, তাতে কি হয়েছে, আমাকে ‘সুপর্নাদি-মাসির’ বাড়ীতে নামিয়ে তুমি আবার বাড়ীতে এসে খাতা নিয়ে যেয়ো !! দাঁত কিড়মিড় করে রাস্তায় মন দিই| মাথা দপদপ করছে|
ছেলেকে নামিয়ে কর্মস্থলে ঘণ্টার পড় ঘণ্টা বকে বকে মুখে ফেকো তুলে ঝিম হয়ে বেরোই যখন ততক্ষণে শরীর চাইছে ঘুম আর মগজ তো জবাব দিয়েই দিয়েছে| বেরিয়ে বাঁদিকে ঘুরেই মনে পড়ে, ওই যাঃ তেনাকেই তো নেওয়া হল না! আবার গাড়ী ঘুরিয়ে বন্ধুর বাড়ী থেকে মাল ডেলিভারি নিতে যাই|
গিয়ে দেখি সে বহাল তবিয়তে জমিয়ে খেলাধুলা করছে দাদাদের সঙ্গে| কিছুতেই আসবে না !! পরদিন আবার একই রুটিন, ভেবেই গায়ে জ্বর আসতে চায় আমার| কোনওমতে সাধ্য-সাধনা করে বাড়ী নিয়ে আসি|
রাত নিঝুম, ঘরে শুধু দু’জন প্রাণী আমরা| এমন সময়ে তিনি মনে করিয়ে দেন, ‘মাম্মা, গতবার স্প্রিং ভেকেশানে আমরা সেই যে ভুতের মুভি দেখলাম না? ক্লোসেটের উপর ভুত বসে হাসছিল, কঞ্জ্যুরিং? !! আবার দেখব হ্যাঁ?’
কী বলবো !! ভয়ে দুঃখে, হতাশায় কান্না পেয়ে যায় আমার !!! এই রাতে ওই কথা মনে না করালেই যেন চলছিল না !!
যাই হোক, আবার সেই দু’জনের দুই প্রস্থ খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে বার বাড়ীর শেষ লাইটটা নিভিয়ে দৌড় দিয়ে বেডরুমে ঢুকছি (অন্ধকার করে দিলেই কেমন মনে হয় পিছন থেকে ওই কী যেন আসছে তেড়ে, আর আমারও চলার গতি পাল্লা দিয়ে বেড়ে যায়) এমন সময়ে তেনার বাবার ভিডিও কল|
‘কী করছ বাবা, খেয়েছ? ঘুমাওনি এখনো? মাম্মা কী করছে?’
‘হ্যাঁ বাবা, তোমার খাওয়া হয়ে গ্যাছে? হাউ ওয়াজ ইয়োর ডে?’ দুপক্ষে এবম্বিধ আদিখ্যেতা চলতে থাকে খানিকক্ষণ| সারাদিনের ঘূর্ণিপাক স্মরণ করে এই আমড়াগাছিতে অংশগ্রহণ করতে একটুও ইচ্ছে করেনা আমার| সব জায়গায় সব ঠিক আছে আঁচ করে তিনি অতঃপর ভিডিও কল শেষ করে আমাদের রেহাই দ্যান| শেষ লাইটটা নিবিয়ে ঘুমানোর বিস্তর চেষ্টা করি, এখানে খুট, ওখানে খটাৎ, ছাদে খুরখুর, নানা সন্দেহজনক আওয়াজ শুনতে শুনতে অনেক পরে চোখ লেগে আসে|
এইভাবে সপ্তাহশেষে, দুঃসময় প্রায় মেরে এনেছি এমন বোধ হতে থাকে|
ফিরে সেদিন মুখী কচুর ডালনা বানাতে শুরু করি| ঘাড় গুঁজে কচু কাটি| খোসা ছাড়ালেই কচুগুলো অবাধ্যর মতন পেছল হয়ে যায়| একটু অসাবধান হয়েছ কি রক্তগঙ্গা| আমার ছুরিগুলো আবার সবকটা বড়-বড়, শান-দেওয়া ধারালো চকচকে ফলা| মানুষ খুন করা চলে তা দিয়ে| তাই এসব ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়| ইতিমধ্যে ঘাড়ের কাছে দপদপ করছে বুঝতে পেরে, রান্না কষানোর মাঝে মাঝে একবার করে শুয়ে পড়ি| বার দুয়েক পর উঠতে গিয়ে দেখি ঘর টলে যাচ্ছে, কিছুতেই ব্যাল্যান্স ফিরছে না মাথায় !! আবার হতচ্ছাড়া ভারটিগো মাথা চারা দিলো নাকী !! কোনমতে রান্না আর্দ্ধেক শেষ করেই শুয়ে পড়তে হয়| উঠলেই মাথা প্রবল পাক দিয়ে উঠছে!! ঘাড়ের কাছে দপদপ, খুব প্যাল্পিটেশান|
‘মাম্মা, আর ইউ ওকে?’ ছেলের প্রশ্নে কান্না পায় !! আমার কিছু হলে এটাকে দেখবে কে? কিছুতেই ঠিক হচ্ছে না কেন !! প্রেশার বাড়লো? কই কোনও অনিয়ম তো করিনি| গত ক’দিনে অতিরিক্ত চাপ কিছু ছিল কি? কই না তো| দিব্যি খাচ্ছি-দাচ্ছি-ঘুমাচ্ছি বগল বাজাচ্ছি, কেন এরকম হল| কেন?
প্রশ্নটা মাথায় পাক খেতে থাকে, ঠিক যেমন ঘরটা পাক খেতে থাকে চোখের সামনে, চোখ খুললেই|
বিঃ দ্রঃ – এসব বেশ ক’দিন আগের কথা, এখন সব বিলকুল ঠিকঠাক আছে| অত সহজে পটল তুলতে জন্মাইনি মশাই| বেশ ক’টাকে উচিৎ শিক্ষে দিয়ে যমের বাড়ী পাঠিয়ে তবে গিয়ে পাততাড়ি গোটানর কথা ভেবে রেখেছি| জয় মা|